Ajker Patrika

জাহাজভাঙা শিল্পে ১০ বছরে ১০৪ মৃত্যু: যে কারণে বারবার প্রাণঘাতী ঘটনা

সবুর শুভ, চট্টগ্রাম ও সবুজ শর্মা শাকিল, সীতাকুণ্ড
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৩৭
জাহাজভাঙা শিল্পে ১০ বছরে ১০৪ মৃত্যু: যে কারণে বারবার প্রাণঘাতী ঘটনা
জাহাজভাঙা কারখানায় বিস্ফোরণ। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক মারা গেছেন। আজ শুক্রবার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাহাজভাঙা শিল্পের ৬৬ বছরের ইতিহাসে এক দিনে এত শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম।

নিহত ৯ শ্রমিকের নাম হলো- মো. রানা (২৫), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), দুই সহোদর ভাই মনসুর উদ্দিন (৪০), নাসির উদ্দিন (৩৮), হাবিবুর রহমান (৫০) ও মতিউর রহমান (২০)।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাতে মতিউর রহমান নামের এক শ্রমিককে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে সাতজন চিকিৎসাধীন বলে খবর পেয়েছি। এ ঘটনায় মোট ৯ জন মারা গেছেন।’

জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)-এর অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন জানিয়েছেন, গত ১০ বছরে এই শিল্পে দুর্ঘটনায় ১০৪ জন শ্রমিক মারা গেছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও কয়েক শ শ্রমিক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ৫০ জন শ্রমিক মারা গেছেন। সবশেষ ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় চলতি বছরে দুই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২।

বিলসের কো-অর্ডিনেটর ও শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাহাজভাঙা শিল্পে ৫০ শ্রমিক মারা গেছেন।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, বর্তমানে ৩০টি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড রয়েছে। আরও ৩৫ থেকে ৪০টি ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। একটি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড গড়ে তুলতে কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়।

দেশে জাহাজভাঙা শিল্পের সূচনা হয় ১৯৬০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে আটকে পড়া একটি জাহাজ কাটার মাধ্যমে। পরে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জাহাজ ‘আল আব্বাস’ কাটা হয়। কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কস ১৯৭৪ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে জাহাজভাঙার কাজ শুরু করে। পরে সীতাকুণ্ড উপকূলে দেশের প্রথম ও একমাত্র জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে ওঠে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, গ্রিন শিপ ইয়ার্ডের অধিকাংশই নামমাত্র গ্রিন। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি থেকে এসব কারখানা অনেক দূরে থাকায় বারবার দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণ যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত।

তপন দত্ত বলেন, ‘শ্রমিকেরা এখনো চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, যার প্রমাণ আজকের ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি এই খাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শ্রমিকদের নিয়মের চেয়ে বেশি সময় কাজ করানো হলেও উপযুক্ত মজুরি দেওয়া হয় না। বন্ধের দিনেও কাজ করানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন মানা হয় না। নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় এড়ানোর প্রবণতাও দেখা যায়।’

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বারবার দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব, বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি ও অব্যবস্থাপনা, পুরোনো জাহাজ কাটার আগে জমে থাকা গ্যাস বা দাহ্য পদার্থ সঠিকভাবে নিষ্কাশন না করা এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম না দেওয়া। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধি বা কমপ্লায়েন্স ঠিকমতো না মানা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কর্তৃপক্ষের অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং জরুরি চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকাও দায়ী বলে মনে করছেন তপন দত্ত ও মোহাম্মদ আলী শাহীন।

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় এলএনজি পরিবহনকারী যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, ওই ধরনের জাহাজ আগে গ্যাসমুক্ত করে তারপর কাটতে হয়। কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকতে পারে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম।

শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই সীতাকুণ্ডের ‘ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় এই মামলা করা হয়।

চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘ওই শিপইয়ার্ডে গিয়ে কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান আমাদের কর্মকর্তারা। এরপর এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়। এতে কোনো কাজ না হওয়ায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে কারখানাটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।’ তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট।

ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, জাহাজভাঙা কারখানার মালিকেরা স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনতে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নেন। ঋণ পরিশোধের চাপ থাকায় তাঁদের মনোনীত ঠিকাদারদের জাহাজ কাটতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ঠিকাদারেরা তা বাস্তবায়নে শ্রমিকদের বিশ্রাম ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে কাজ করান। সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি ও দ্রুত কাজ করানোর চাপের কারণে প্রাণহানি ও অঙ্গহানির ঘটনা ঘটে।

আরও পড়ুন:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত