Ajker Patrika

এলএনজিবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজটির গ্যাস অপসারণ ছাড়াই কাটাকাটির কারণে দুর্ঘটনা: ফায়ার সার্ভিস

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ৪১
এলএনজিবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজটির গ্যাস অপসারণ ছাড়াই কাটাকাটির কারণে দুর্ঘটনা: ফায়ার সার্ভিস
সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ে বিস্ফোরণে শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় পুরোনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) স্ক্র্যাপ জাহাজে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আরও দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার না করে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে কারখানাটিতে ভাঙচুর চালিয়েছে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে জাহাজের কাটিং কাজ চালানোর কারণেই এই মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটেছে।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি একটি এলএনজি বহনকারী স্ক্র্যাপ জাহাজ ছিল। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাবিধি অনুযায়ী, এ ধরনের জাহাজে কাটিং বা কাটাকাটির কাজ শুরু করার আগে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ গ্যাস অপসারণ (Gas-freeing) করা বাধ্যতামূলক। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ সেই সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ না নিয়েই কাটিং কাজ শুরু করায় ভেতরে জমে থাকা গ্যাসে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে।

তৌফিকুল ইসলাম আরও জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে দুই শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করে কারখানার ভেতরে রাখা হয়েছিল। আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর ও মর্গে মোট ৬ জনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সাগরে জোয়ারের কারণে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও ভাটা নামলে পুনরায় অনুসন্ধান চালানো হবে।

নিহত ও আহত শ্রমিকদের স্বজনদের অভিযোগ, বিস্ফোরণের পর আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা না করে কারখানার ভেতরে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ফেলে রাখা হয়। আহতদের চিৎকার শুনে বাইরে থেকে স্বজন ও স্থানীয়রা ছুটে গেলেও কারখানার মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। এমনকি বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করে উপস্থিত লোকজনকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা কারখানার ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে যন্ত্রণাকাতর শ্রমিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

স্বজনদের দাবি, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার কারণেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক জটিলতায় শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।

উদ্ধার অভিযানের পর উত্তেজিত জনতা কারখানা প্রাঙ্গণে ভাঙচুর চালালে সীতাকুণ্ড থানা-পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

হাসপাতালে জাহাজ ভাঙা কারাখানায় বিস্ফোরণে হতাহতদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: আজকের পত্রিকা
হাসপাতালে জাহাজ ভাঙা কারাখানায় বিস্ফোরণে হতাহতদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, হাসপাতালটিতে ছয়জন আহত শ্রমিককে আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বর্তমানে একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চমেক মর্গে নিহতদের মরদেহ রাখা হয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস টিমকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে এবং প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা কারখানায় ভাঙচুর চালিয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছে। দুর্ঘটনার কারণ ও অবহেলার বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘অসাবধানতা’র অভিযোগ প্রসঙ্গে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ স্বীকার করেন যে, স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটিংয়ের সময়ই ঘটনাটি ঘটে। তিনি বলেন, ‘অসাবধানতাবশত গ্যাস লিকেজের কারণে এই দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণ ঘটেছে।’

অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকার জেলেরা জানান, কারখানা-সংলগ্ন সাগর ও খালে দীর্ঘক্ষণ গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়াতে দেখা যায়। গ্যাসের তীব্রতার কারণে খালের মুখে মাছ ধরার নৌকা ভিড়ানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত