Ajker Patrika

সংকটে শীর্ষ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান: অস্থিরতা কাটছে না ব্রিতে

  • বিশৃঙ্খলার তিন মাস পরও জমা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন
  • নতুন ডিজি নিয়োগের পরও প্রশাসনিক অস্থিরতা কাটেনি
  • এখন পরিস্থিতি ‘অনেক ভালো’ বলে দাবি করেছেন ডিজি
সাইফুল মাসুম, ঢাকা 
সংকটে শীর্ষ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান: অস্থিরতা কাটছে না ব্রিতে

মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) শুরু হওয়া অস্থিরতা কাটছে না। বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডিজি নিয়োগকে কেন্দ্র করে কার্যত দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছেন। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি গবেষণাকাজ বা উদ্ভাবনের চেয়ে প্রশাসনিক সংকট, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মতো অভিযোগের খবরেই আলোচনায় এসেছে বেশি।

কৃষি মন্ত্রণালয় গত ৩ মে ড. আমিনুল ইসলামকে ব্রির মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেয়। এ পদে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ওই দিন সন্ধ্যায়ই গাজীপুরে অবস্থিত ব্রির সদর দপ্তরের বিভিন্ন কক্ষ ও ল্যাবে তালা দেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের একাংশ। ৪ মে নতুন ডিজিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভে নামেন তাঁরা। অন্যদিকে সেদিন আরেকটি পক্ষের সদস্যরা আমিনুল ইসলামকে স্বাগত জানিয়ে ব্রির মূল ফটকে অবস্থান নেন। দিনভর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে দেখা দেয় অচলাবস্থা। এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখার অভিযোগ ওঠে ব্রির তৎকালীন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হাবিবুর রহমান মুকুল এবং তৎকালীন পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ কর্মসূচির জেরে ডিজি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির দুই দিনের মাথায় (৫ মে) তা বাতিল করে কৃষি মন্ত্রণালয়। সবশেষ গত ১৫ জুলাই আগের ডিজির নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী মো. রফিকুল ইসলামকে ব্রির মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) পদে নিয়োগ দিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন আসেনি তিন মাসেও

আমিনুল ইসলামকে ডিজি নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিশৃঙ্খলার ঘটনার তদন্তে ২০ মে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ঘটনার তিন মাস হয়ে গেলেও তা দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ দুবার বাড়ানো হয়েছে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কামরুল হাছান আজকের পত্রিকাকে এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছি। আগামী সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব।’

নতুন ডিজি এলেও অস্থিরতা কাটেনি

মো. রফিকুল ইসলাম ব্রির মহাপরিচালক পদে যোগ দেওয়ার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসনিক অস্থিরতা কাটেনি। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও বেড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রির একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুই দিনের জন্য ডিজি থাকা আমিনুল ইসলামকে স্বাগত জানিয়ে যাঁরা ব্রির সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকে এখন চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে। কোনো কোনো কর্মকর্তা হামলার শিকারও হয়েছেন। মো. রফিকুল ইসলাম নতুন ডিজি নিযুক্ত হওয়ার চার দিনের মাথায় গত ১৯ জুলাই অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে উত্তেজনা ছড়ালে পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই দিনই ব্রি কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তিন সপ্তাহ পরও তা জমা পড়েনি। এ নিয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ব্রির ধানভিত্তিক খামার বিন্যাস বিভাগের প্রধান ড. মো. ইব্রাহিম গত মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সবাই ব্যস্ত, তাই তদন্তে সময় লাগছে। চলতি সপ্তাহের শেষে প্রতিবেদন জমা দেব।’

মোহাম্মদ রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা নিয়ে বিরোধের জেরে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ছাড়া তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলা হয়। পরবর্তী সময়ে ফোন ফেরত পেয়ে তিনি রিসাইকেল বিন থেকে ভিডিও উদ্ধার করে সংরক্ষণ করেছেন।

এ ছাড়া আমিনুল ইসলামকে অভ্যর্থনা জানাতে অবস্থান নেওয়া পাম্প অপারেটরসহ চারজনকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে বর্তমান ব্রি প্রশাসন।

অভিযোগ রয়েছে, ১৩ ও ১৪ মে ব্রিতে অস্থিরতা তৈরির পেছনে নেতৃত্ব দেওয়া তৎকালীন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান মুকুলকে পুরস্কৃত করে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। আর আগের ডিজির নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ব্যানার ধরার পুরস্কার হিসেবে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামকে পার্টনার প্রকল্পের ব্রির অংশের ডিপিডি বানানো হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্রির বর্তমান মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। আর একজন কর্মকর্তা হামলার শিকার হয়েছেন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। ইনস্টিটিউটে তালা মারা ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় নেতৃত্ব দেওয়া কাউকে পুরস্কৃত করার অভিযোগ সঠিক না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত