Ajker Patrika

নির্বাচনের জন্য সবাই প্রস্তুত, তবু কেন সংশয় জনমনে

কামরুল হাসান
নির্বাচনের জন্য সবাই প্রস্তুত, তবু কেন সংশয় জনমনে
ভোটের মাঠে প্রস্তুতি দেখা গেলেও অনেকে সন্দেহ করেন নির্বাচন হবে কি না। ছবি: আজকের পত্রিকা

নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সব রাজনৈতিক দল এখন মাঠে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা—কোথাও চলছে সভা, কোথাও কর্মসূচি, কোথাও ডিজিটাল প্রচার। এই নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতাসীন দল আর বিরোধী দল বলে কিছু নেই। ক্ষমতাসীনেরা থাকলে তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলত। বিপরীতে বিরোধীরা বলত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির কথা। এখন সবাই এক লাইনে, সবার মুখেই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি।

নির্বাচন কমিশনও বসে নেই। তারা প্রতি ওয়াক্তেই প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছে, আর সরকার বলছে—সংবিধান অনুযায়ী সময়মতো নির্বাচন আয়োজনই তাদের অগ্রাধিকার। বাহিনীগুলোর ভেতরেও নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি কম নেই। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচনী মাঠের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে যেতে ভোটারদের বাধা দেওয়া কিংবা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ‘র‍্যাগিং’ করার চেষ্টা করা হলে সেনাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নেবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার বিষয়েও তিনি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলেছেন।

এই চিত্র দেখে স্বাভাবিকভাবে মনে হওয়ার কথা, দেশ নির্বাচনের পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। জনমনে এখনো রয়ে গেছে গভীর সংশয়। অনেক মানুষ প্রকাশ্যেই বলছেন—নির্বাচন আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, নির্বাচন হলেও সেটি হবে কেবল আনুষ্ঠানিকতা। প্রশ্ন হলো, এত আয়োজনের মধ্যেও কেন জনমনে এত অনিশ্চয়তা? নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তার সারমর্ম যা দাঁড়ায় তা হলো, এই সংশয়ের পেছনে প্রথম ও সবচেয়ে বড় কারণ হলো অতীতের অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের স্মৃতি মানুষের মন থেকে এখনো মুছে যায়নি। বিশেষ করে ভোট দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়া, ভোটের আগেই ফলাফল ঠিক হয়ে যাওয়া, বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে টিকে থাকতে না পারা—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি করেছে। ফলে নতুন করে নির্বাচন এলেই মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছে।

এর কারণও আছে। নির্বাচন শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ লক্ষ করছে, রাজনৈতিক উত্তাপ থাকলেও আস্থার জায়গাটি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। মাঠে দলগুলো সক্রিয়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই মাঠ কি সবার জন্য সমান? মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ, প্রচারণা—সব ক্ষেত্রে কি সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর মানুষ এখনো পাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে। দু-একটা দলের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ করা হয়েছে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো, রাজনৈতিক সংলাপের অভাব। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাজনৈতিক আস্থার পরিবেশ থাকাটা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে যে অনাস্থা ও সংঘাতের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা এখনো কাটেনি।

সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—সব পক্ষ কি সত্যিই এই নির্বাচনকে নিজেদের নির্বাচন বলে মনে করছে? যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু মানুষ এখন শুধু বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে চায় না। তারা দেখতে চায়, প্রশাসন বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষ থাকে, নির্বাচন কমিশন কতটা দৃঢ় ভূমিকা নেয়। অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এই জায়গায় মানুষের প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনি সন্দেহও প্রবল।

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন যতই বলুক তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে, মানুষের মনে সেই বিশ্বাস পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কমিশনের সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও ভূমিকা—সবকিছুই এখন বাড়তি নজরে দেখা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে গণতন্ত্রের জন্যও একটি সতর্কসংকেত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এই সংশয়ের পেছনে ভূমিকা রাখছে। আগের নির্বাচনগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষও জানে। বিদেশি পর্যবেক্ষক, কূটনৈতিক তৎপরতা, ভিসা নীতি—এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অনেকেই ভাবছেন, আন্তর্জাতিক চাপ বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষ মুহূর্তে নির্বাচনের গতিপথ বদলে দিতে পারে কি না।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও আছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা মানুষকে সতর্ক করে তুলেছে। মানুষ এখন আর আগেভাগে আশাবাদী হতে চায় না। তারা অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখার জন্য।

এই অপেক্ষা থেকেই জন্ম নেয় সংশয়—নির্বাচন হবে কি না, আর হলেও তা কতটা অর্থবহ হবে।

তবে এই সংশয়ের সব দায় একতরফাভাবে সরকারের ওপর চাপানোও বাস্তবসম্মত নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলো নিজেরাই বারবার অনিশ্চয়তার কথা বলে, তাহলে জনমনে আস্থা তৈরি হবে কীভাবে? রাজনীতিবিদদের বক্তব্য ও আচরণ সাধারণ মানুষের মনোভাব গঠনে বড় ভূমিকা রাখে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

নির্বাচন নিয়ে এই অনিশ্চয়তা গণতন্ত্রের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। কারণ, গণতন্ত্রের মূল শক্তি মানুষের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস দুর্বল হলে নির্বাচন আয়োজন করা যতই নিয়মমাফিক হোক না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি নির্বাচন তখন কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও একেবারে অজানা নয়। কথার চেয়ে কাজে আস্থা ফেরানোই এখানে সবচেয়ে জরুরি। নির্বাচন কমিশনকে আরও দৃশ্যমানভাবে স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে এমনভাবে, যেন মানুষ তা চোখে দেখতে পায়। রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে—নির্বাচনকে কেবল জয়ের লড়াই নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।

সবশেষে বলতে হয়, নির্বাচন হবে কি না—এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারলে জনমনের সংশয় অনেকটাই কাটবে।

সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দল—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল সেই আস্থা ফিরতে পারে। কারণ, নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার বিশ্বাসের বড় পরীক্ষাও বটে। এখন সেই পরীক্ষায় ফলাফল কী হয়, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত