
১৯৬১ সালের ১৯ মে। সেদিন ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় যে অভূতপূর্ব ও আত্মত্যাগের গাথা রচিত হয়েছিল, আজ তা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য এবং চিরস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৫২ সালের ঢাকার রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের ঠিক ৯ বছর পর আসামের মাটিতে পুনরায় বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ।
আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ‘অসমীয়া’ ভাষাকে প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার একপক্ষীয় ও বৈষম্যমূলক সরকারি অপচেষ্টা শুরু হলে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অস্তিত্ব রক্ষার সংকট দেখা দেয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা কর্তৃক বিধানসভায় ‘রাজ্য ভাষা বিল’ উত্থাপনের প্রতিবাদে করিমগঞ্জ, শিলচর ও হাইলাকান্দির সাধারণ মানুষ ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে এক বিশাল গণ-আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯ মে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে সমবেত হাজার হাজার সত্যাগ্রহীর ওপর আধা সামরিক বাহিনী ও পুলিশ নির্বিচারে ১৭টি গুলি বর্ষণ করলে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ।
এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী, কুমুদ দাস, তরণী দেবনাথ, হীতেশ বিশ্বাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, বীরেন্দ্র সূত্রধর ও সত্যেন্দ্রকুমার দেব শহীদ হন। তাঁদের এই বীরত্বপূর্ণ ত্যাগের ফলেই শেষ পর্যন্ত আসাম সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। এই শহীদদের অধিকাংশই ছিলেন দেশভাগের বলি হওয়া অত্যন্ত সাধারণ ও শরণার্থী পরিবার থেকে আসা মানুষ, যাঁরা নিজেদের জমি হারানোর যন্ত্রণার চেয়েও মাতৃভাষার সম্মানকে বড় করে দেখেছিলেন। বিশেষ করে ১৬ বছর বয়সী কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য ছিল বিশ্বের প্রথম নারী ভাষাশহীদ, যে মাত্র ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই ভাষার টানে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। এই মহান আত্মত্যাগের স্মৃতিতে প্রতিবছর ১৯ মে ‘বাংলা ভাষাশহীদ দিবস’ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পালিত হয়ে আসছে।
ভাষার অধিকার আদায়ের এই গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম কেবল বাঙালি জাতির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ নিজ নিজ ভাষার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত ও সালামের আত্মত্যাগ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদের সেই বীরোচিত রুখে দাঁড়ানো সারা বিশ্বের শোষিত ও ভাষাগত সংখ্যালঘু মানুষের জন্য এক অবিস্মরণীয় প্রেরণা হয়ে আছে। ঢাকার সেই আন্দোলন ছিল মূলত একটি জাতির স্বকীয়তা রক্ষার লড়াই, যা পরবর্তী সময়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পথ প্রশস্ত করেছিল।
ভারতের মানভূম অঞ্চলেও ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষার জন্য দীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল আন্দোলন হয়েছিল। তৎকালীন বিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত মানভূমে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে অতুলচন্দ্র ঘোষ ও লাবণ্যপ্রভা ঘোষের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ পদযাত্রা করে আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন। ‘টুসু’ গানের মাধ্যমে সেই লড়াই ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের মাঝে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিহারের মানভূম জেলা থেকে কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা গঠিত হয়, যা ছিল ভাষার ভিত্তিতে এলাকা পুনর্বিন্যাসের এক বড় জয়।
ভারতের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের কালো সময়েও ভাষার লড়াই প্রাণ কেড়েছে বহু তরুণের। ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটোতে স্কুলশিক্ষার্থীদের এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে হেক্টর পিটারসনসহ বহু ছাত্র শহীদ হয়েছিল। মূলত কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের ওপর তাদের নিজস্ব ভাষার পরিবর্তে ‘আফ্রিকান’ ভাষা বা ‘শোষকের ভাষা’ চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। হেক্টর পিটারসনের সেই রক্তাক্ত মরদেহ নিয়ে তার বোনের দৌড়ে পালানোর ছবি আজও বিশ্ববাসীর কাছে ভাষার প্রতি মমত্বের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে। সোয়েটোর সেই বিদ্রোহ দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিকামী মানুষের চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক মহলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ধিক্কার ছড়িয়েছিল।
একইভাবে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ায়ও বিভিন্ন সময়ে বালুচ ও পশতু ভাষার স্বকীয়তা রক্ষায় বহু রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ জেল-জুলুম এবং জীবন উৎসর্গের শিকার হয়েছেন। পাঞ্জাবি ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ আজও তাঁদের সাংস্কৃতিক অধিকারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালে নেওয়ারি ভাষা এবং শ্রীলঙ্কায় তামিল ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির লড়াইয়ে অগণিত মানুষ তাঁদের জীবন ও যৌবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ১৯৫৬ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘অনলি সিনহালা’ আইন পাসের পর থেকে শুরু হয় তামিলদের দীর্ঘ বঞ্চনা, যা একসময় সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নেয়। কয়েক দশক ধরে চলা এই লড়াইয়ে হাজার হাজার তামিল প্রাণ দিয়েছেন কেবল তাঁদের ভাষার অধিকার ও স্বাধিকার নিশ্চিত করতে।
এই প্রতিটি সংগ্রাম ও প্রতিটি রক্তপাত আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে ভাষা কেবল ভাববিনিময়ের মাধ্যম নয়। এটি একটি জাতির আত্মা, পরিচয় এবং বেঁচে থাকার অধিকার। এই প্রতিটি আত্মত্যাগের কাহিনি আমাদের হৃদয়ে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে যে কামানের গোলা বা বন্দুকের গুলিতে কোনো জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে কখনো চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না। শহীদদের রক্তে ভেজা এই ইতিহাসগুলো আমাদের দায়িত্ব দেয় নিজ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে।

নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সব রাজনৈতিক দল এখন মাঠে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা—কোথাও চলছে সভা, কোথাও কর্মসূচি, কোথাও ডিজিটাল প্রচার। এই নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতাসীন দল আর বিরোধী দল বলে কিছু নেই। ক্ষমতাসীনেরা থাকলে তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলত। বিপরীতে বিরোধীরা বলত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির কথা। এখন
১৪ ঘণ্টা আগে
একটি দেশের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা মূলত নির্ভর করে সেই দেশের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক দর্শনের ওপর। রাজনীতি ও পরিবেশকে অনেকে আলাদা ফ্রেমে দেখতে চান, কিন্তু আদতে এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়ন নীতি সরাসরি প্রকৃত
১৪ ঘণ্টা আগে
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাঁরা এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, তাঁদের কাছে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অন্য রকম উচ্ছ্বাসের। ব্যালট পেপার দেখতে কেমন; এই কাগজে যে ছাপ্পর দিতে হয়, সেই সিলটা কেমন কিংবা ভোটদান শেষে আঙুলে কালির দাগ দিয়ে দিলে কেমন হবে প্রথম ভোট দেওয়ার অনুভূতি—সবকিছুই একজন নব্য ভোটারের জন্য
১৪ ঘণ্টা আগে
কত কিছুই না ঘটছে চারপাশে! চাঁদাবাজি-হাদিয়ার আক্রমণে জনগণ যখন দিশেহারা, তখন ঝোপ বুঝে কোপ মারার চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ। সে রকমই একটা কাণ্ড ঘটেছে রাজশাহীতে। সুকৌশলে দখলদারির এমন নমুনা আগেও হয়তো দেখা গেছে, কিন্তু এ সংস্কৃতির কি কোনোই পরিবর্তন হবে না?
২ দিন আগে