Ajker Patrika

বরিশালের ২১ আসন: বিএনপির ঘাঁটিতে বড় ভাগ বসাতে পারে জামায়াত

  • ধানের শীষ জয় পেতে পারে ১০টি আসনে।
  • দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের সম্ভাবনা ছয়টিতে।
  • হাতপাখার জয়ের আশা তিনটি আসনে।
খান রফিক, বরিশাল 
বরিশালের ২১ আসন: বিএনপির ঘাঁটিতে বড় ভাগ বসাতে পারে জামায়াত

বরিশালের ২১টি আসনে জাতীয় নির্বাচনের প্রচার এখন তুঙ্গে। ভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অস্থিরতা-সহিংসতা। একসময়ের ঘাঁটি বরিশাল বিভাগে বিএনপি এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে। বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে অর্ধেকেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ধানের শীষের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখার। এ ছাড়া দুটি আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বরিশাল: এই জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। এর মধ্যে বরিশাল-১, বরিশাল-৪ এবং বরিশাল-৫ আসন রয়েছে।

বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিএনপিকে। এখানকার ধানের শীষের প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন ২০০১ সালে এমপি থাকাকালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া ১/১১-তে স্বপনকে সংস্কারপন্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুস সোবাহান। তিনি বলেন, ‘হিন্দুদের রক্ষার জন্য প্রার্থী হয়েছি।’ প্রায় প্রতিদিনই এই আসনে সোবাহানের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠছে।

বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনে আওয়ামী লীগের শূন্য মাঠে বিএনপির শরফুদ্দীন সান্টুর জয়ের হিসাব জটিল করে তুলেছে দলের একদল নেতা-কর্মী। বানারীপাড়া উপজেলার সহসভাপতি গোলাম মাহবুব ও পৌর কৃষক দলের আ. গাফফার হোসেনসহ কয়েক শ নেতা-কর্মী গত ৩০ জানুয়ারি জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। যোগদানের পরপরই তাঁরা জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল মান্নানের জন্য ভোট চাইতে মাঠে নেমেছেন। মনোনয়নবঞ্চিত দুই কেন্দ্রীয়সহ বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু ও সাবেক ছাত্রদল নেতা দুলাল হোসেন এ পর্যন্ত এলাকায় নির্বাচনী কার্যক্রমে নেই।

বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির (জাপা) তিনবারের সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু (লাঙল)। কারাবন্দী টিপুর জন্য গণসংযোগ করছেন তাঁর মেয়ে। জাপার কেন্দ্রীয় অতিরিক্ত যুগ্ম মহাসচিব ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, মুক্ত টিপুর চেয়ে কারাবন্দী টিপু বেশি শক্তিশালী। তিনি বারবার এই আসনের এমপি হয়েছেন।

বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা) আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রাজীব আহসান এবার ধানের শীষের প্রার্থী। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার আটঘাট বেঁধে নেমেছেন। জেলায় জয়ের সম্ভাবনা হিসেবে জামায়াত এই আসনটি ১ নম্বরে রেখেছে। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের আজ ৬ ফেব্রুয়ারি মেহেন্দীগঞ্জে সমাবেশ করার কথা। ভোটারদের ভাষ্য, শেখ হাসিনার পতনের পর চরে গরু ও ফসল লুট এবং দখলের জন্য বিএনপির ইমেজ (ভাবমূর্তি) সংকটে রয়েছে।

বরিশাল-৫ (মহানগর-সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম (হাতপাখা)। হাতপাখার ভোট বেড়েছে বলে জানান ফয়জুলের মিডিয়া সেলের প্রধান নাসির উদ্দিন নাইস। তবে সরোয়ারের ঘনিষ্ঠ সহচর আনোয়ারুল হক তারিন বলেন, এই আসনে বারবার সরোয়ারকে ভোট দিয়ে জনগণ নির্বাচিত করেছেন। গত বুধবার তারেক রহমানের সফরে তাঁদের সাংগঠনিক অবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম ও জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি মো. মাহমুদুন্নবী। ফয়জুল করিমের দাবি, বরিশাল ৫ ও ৬ আসনে আওয়ামী লীগের নিরীহ ভোটাররা তাঁকে ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনি মামলা ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

পটুয়াখালী: এই জেলার চারটি আসনের মধ্যে দুটিতে সহজ জয় পেতে পারে বিএনপি। তবে পটুয়াখালী-২ আসনে দাঁড়িপাল্লা এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মজবুত অবস্থানে রয়েছেন।

পটুয়াখালী-১ (সদর-দুমকি-মির্জাগঞ্জ) আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং ১০ দলীয় জোটের এবি পার্টির প্রার্থী ডা. মেজর (অব.) ওহাব মিনার। সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী সহজে জয় পাবেন।

পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে পাঁচজন প্রার্থী। এর মধ্যে মূল লড়াই হবে জামায়াতের প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং বিএনপির শহিদুল আলম তালুকদারের। সাধারণ জনগণ মনে করেন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে আসনটিতে। জামায়াতের প্রার্থী তরুণদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদারকে হারানো কঠিন। জামায়াত মনে করে, এখানে জয়ের সম্ভাবনা বেশি। এই আসনের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আজ ৬ ফেব্রুয়ারি বাউফলে আসছেন জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমান।

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) আসনে বিএনপির জোটের প্রার্থী ভিপি নুরুল হক নুর ও বিএনপির বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঝামেলা হয়েছে। আসনটি অধিকতর সংঘাতপ্রবণ হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে সেনা মোতায়েন রয়েছে। হাসান মামুনের পক্ষে ভেতরে-ভেতরে কাজ করছেন দলটির সাধারণ নেতা-কর্মীদের একাংশ।

(পটুয়াখালী-৪-এ (কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী) বিএনপির প্রার্থী এ বি এম মোশারফ হোসেন। এই আসনে জামায়াতে সদ্য যোগদানকারী প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানও আছেন। তবে এ বি এম মোশারফ বেশ শক্ত প্রার্থী এখানে।

ভোলা: দ্বীপজেলা ভোলার চারটি আসনের মধ্যে ভোলা-১ এবং ভোলা-২ আসনে ধানের শীষের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বরাবরই শক্ত অবস্থানে বিএনপি।

ভোলা-১ (সদর) আসনে প্রার্থী চারজন। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী আন্দালিভ রহমান পার্থর গরুর গাড়ি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মো. নজরুল ইসলাম মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপির জোটের প্রার্থী পার্থ ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থানে থাকলেও দলটির একাংশ দাঁড়িপাল্লার দিকে ঝুঁকে গেছে। যে কারণে সহজেই আসনটিতে পার্থ বিজয়ী হতে পারবেন না বলে মনে করেন ভোটাররা।

ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা ফজলুল করিম। এই আসনটি সংঘাতপ্রবণ এলাকা। তবে ৫ আগস্টের পর বিএনপির ইমেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে দাঁড়িপাল্লার কাছে।

ভোলা-৩ (লালমোহন ও তজুমদ্দিন) আসনে প্রার্থী পাঁচজন। বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ নিজামুল হক নাঈম। তবে আসনটিতে সহজেই বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হবেন বলে ভোটাররা মনে করেন।

ভোলা-৪ (চরফ্যাশন ও মনপুরা): মোট প্রার্থী সাতজন। এর মধ্যে মূল লড়াই হবে ধানের শীষের নুরুল ইসলাম নয়নের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামের অধ্যাপক মোস্তফা কামালের।

ঝালকাঠি: ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসনে প্রার্থী সাতজন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষের রফিকুল ইসলাম জামাল এবং দাঁড়িপাল্লার ভাইরাল হওয়া ড. ফয়জুল হকের মধ্যে। এই আসনটি থেকে ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর ছিটকে পড়ায় বিএনপিতে একাধিক গ্রুপিং (পক্ষ) দেখা দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে চান বিএনপি থেকে জামায়াতে যোগ দিয়ে শক্ত প্রার্থী হওয়া ফয়জুল হক।

ঝালকাঠি-২ (সদর ও নলছিটি) আসনে আটজন প্রার্থী। এর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, দাঁড়িপাল্লার শেখ নেয়ামুল করিম এবং হাতপাখার ড. সিরাজুল ইসলাম সিরাজির। ঝালকাঠির আইনজীবী মিজানুর রহমান মুবিন বলেন, এই আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টুর সহজ জয় হতে পারে। অন্যদিকে ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়ত বেশ শক্ত অবস্থানে আছে।

বরগুনা: উপকূলীয় এলাকা বরগুনার দুটি সংসদীয় আসনে কখনোই বিএনপি বিজয়ী হতে পারেনি। এবার আসন দুটি দখলে মরিয়া দলটি।

বরগুনা-১ (বরগুনা সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোট চারজন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষের নজরুল ইসলাম মোল্লা এবং হাতপাখার মো. ওলি উল্লাহর মধ্যে। ইসলামী আন্দোলন মনে করে, এই আসনটিতে তাদের প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি।

বরগুনা-২ (বামনা-বেতাগী-পাথরঘাটা) আসনে নয়জন প্রার্থী রয়েছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের মো. নুরুল ইসলাম মনি ও দাঁড়িপাল্লার ডা. সুলতান আহমেদ।

পিরোজপুর: এই জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুটিই সাঈদীর পুত্ররা দখলে নিতে চান। পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-ইন্দুরকানী) আসনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন ও জামায়াতের মাসুদ সাঈদীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে।

পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-নেছারাবাদ-কাউখালী) আসনে প্রার্থী ছয়জন। বিএনপির সোহেল সুমন মঞ্জুর এবং জামায়াতের শামিম সাঈদী ভোটের মাঠে তৎপর।

পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে ছয়জন প্রার্থী। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির রুহুল আমিন দুলাল এবং হাতপাখার ডা. রুস্তুম আলী ফরাজীর মধ্যে। তবে উপজেলা বিএনপির কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে এবারও ডা. ফরাজী জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে—বলছেন সাধারণ ভোটাররা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক নিয়ে যা বলল সেনাবাহিনী

আগুন দিয়েছে মামুন, কাঠ দিয়েছে জুয়েল: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক এসআই মালেক

কোরিয়ান ড্রামা না বাবার দুই কোটির ঋণ, তিন বোনের মৃত্যুর নেপথ্যে কী

আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানো ও হত্যা মামলা: সাবেক এমপি সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

মিরপুরে বাসা থেকে দুই সন্তানসহ বাবা-মায়ের মরদেহ উদ্ধার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত