Ajker Patrika

পরিবেশ রক্ষার রাজনীতি ও দায়বদ্ধতা

আল শাহারিয়া
পরিবেশ রক্ষার রাজনীতি ও দায়বদ্ধতা
সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে আমাদের রক্ষা করে আসছে। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

একটি দেশের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা মূলত নির্ভর করে সেই দেশের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক দর্শনের ওপর। রাজনীতি ও পরিবেশকে অনেকে আলাদা ফ্রেমে দেখতে চান, কিন্তু আদতে এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়ন নীতি সরাসরি প্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। যখন কোনো সরকার বা নীতিনির্ধারক মহল পরিবেশকে উপেক্ষা করে কেবল তথাকথিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক সূচকের দিকে নজর দেয়, তখন দীর্ঘ মেয়াদে তা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয়। আমরা প্রায়ই লক্ষ করি, উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বন উজাড় করা হচ্ছে কিংবা নদী ভরাট করে বড় বড় অট্টালিকা গড়া হচ্ছে। এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে। তাই পরিবেশ ধ্বংসের দায়ভারও দিন শেষে তাঁদের ওপরই বর্তায়।

আমাদের নীতিনির্ধারণী মহলে প্রায়ই একটি মিথ কাজ করে। তারা মনে করে, পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পরবিরোধী দুটি বিষয়। তাদের যুক্তিতে কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ করলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে, বিনিয়োগ কমবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। অথচ উন্নত ও সচেতন বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখতে পাই। টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের মূল কথাই হলো পরিবেশকে অক্ষত রেখে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, গ্রিন টেকনোলজির প্রসার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের ধীরগতি ও অনীহা লক্ষণীয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা দূষণকারী শিল্পের অনুমোদন দেওয়ার আগে পরিবেশগত প্রভাব যাচাই (ইআইএ) অনেক সময় কেবল লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। প্রভাবশালী মহলের চাপে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

শহরাঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে তাকালে আমরা নীতিনির্ধারণী দুর্বলতার চিত্রটি আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আমাদের প্রিয় শহরগুলোকে এক একটি হিট আইল্যান্ডে পরিণত করেছে। জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার সময় শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের কথা একবারও ভাবা হয়নি। এসব প্রকল্প রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বা নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই বাস্তবায়িত হয়েছে। শহরের বাতাস আজ বিষাক্ত, যার প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া। এসব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দেশে আইন আছে, কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই অরাজকতা বন্ধ করা কঠিন কিছু ছিল না। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক না করে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার উৎসাহিত করার নীতিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। একটি জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়তে হলে রাজনৈতিক দর্শন ও পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর মৃত্যু এখন এক সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দখলদারেরা অধিকাংশই স্থানীয় রাজনীতি বা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। নীতিনির্ধারকেরা নদী রক্ষায় কমিশন গঠন করেন ও বড় বড় প্রকল্পের ঘোষণা দেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত নড়বড়ে। নদীকে আইনিভাবে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করার পরেও এর ওপর অত্যাচার কমেনি। এর কারণ হলো, নদী রক্ষার চেয়ে দখলদারদের স্বার্থরক্ষা অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও রাজনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়। কিন্তু উন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পস্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে বলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে গড়িমসি করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল ক্ষতিপূরণ দাবি করাই যথেষ্ট নয়; দেশের অভ্যন্তরেও পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে হবে যে আমরা পরিবেশ রক্ষায় আন্তরিক। এ ছাড়া জলবায়ু তহবিল থেকে পাওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। দুর্নীতির কারণে অনেক সময় এই তহবিলের সুফল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায় না, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

পরিবেশ আইন ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আরেকটি বড় বাধা। পরিবেশদূষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক সময় প্রমাণের অভাবে বা রাজনৈতিক প্রভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। পরিবেশ আদালতগুলোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন। বনভূমি রক্ষা ও বনায়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। সামাজিক বনায়নের নামে অনেক সময় প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানো হয়, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে আমাদের রক্ষা করে আসছে। অথচ বিভিন্ন সময় সুন্দরবনের আশপাশে ভারী শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুনাফার লোভে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল ধ্বংস করলে তার মাশুল দিতে হবে বহু বছর ধরে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তরুণ প্রজন্ম এখন পরিবেশ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা চায় তাদের নেতারা পরিবেশ রক্ষায় কঠোর হোক। গ্রিন পলিটিকস এখন সময়ের দাবি। এর অর্থ হলো প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে কেন্দ্রে রাখা। বাজেট প্রণয়নের সময় পরিবেশ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং দূষণকারী শিল্পের ওপর উচ্চ হারে কার্বন ট্যাক্স আরোপ করা প্রয়োজন। প্লাস্টিক দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বিকল্প পণ্যের বাজার তৈরিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। একজন নাগরিক হিসেবে আমরা রাস্তায় ময়লা ফেলা বন্ধ করতে পারি, কিন্তু কলকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করার ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। সেটি করার জন্য রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের কঠোর হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত