Ajker Patrika

হরমুজ ইস্যুতেই ফের যুদ্ধ, ইরানের ‘সক্ষমতা কমাতে পারবে না’ যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজ ইস্যুতেই ফের যুদ্ধ, ইরানের ‘সক্ষমতা কমাতে পারবে না’ যুক্তরাষ্ট্র
প্রতীকী ছবি

চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমার প্রায় প্রথম মাস শেষ হতে চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বরং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলের অধিকার নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যাগত বিরোধ পরিস্থিতিকে আবারও যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।

তবে উত্তেজনা প্রশমনে আঞ্চলিক দেশগুলো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কয়েক দিন আগে কাতার একটি প্রতিনিধিদল ইরানে পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। পাকিস্তান, কাতার ও ওমানও এই সংকট নিরসনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার। ইরানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার তাদের রয়েছে। অর্থাৎ, কোন জাহাজ চলাচলের অনুমতি পাবে বা পাবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তেহরানের। ইরানের বিশ্বাস, তাদের কাছ থেকে আগাম অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করলে সেটি সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের শামিল হবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াশিংটনের মতে, ইরানকে সরে দাঁড়িয়ে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। এই ব্যাখ্যাগত বিরোধই বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের কারণ এবং এ কারণেই পরিস্থিতি আবারও যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দলের সদস্য অ্যালান আইয়ার বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণকে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা হিসেবে দেখে এবং এখনো সেই নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়। তাঁর ভাষায়, ‘এটি এমন একটি বিষয়, যা যুক্তরাষ্ট্র এখনো মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।’

আইয়ার বলেন, পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনার আগে এই বিরোধের সমাধান জরুরি। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা আপাতত ভুলে যান। এটিই হলো সেই প্রধান বাধা, যেটি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে এবং অতিক্রম করতে হবে, যদি আমরা পারমাণবিক ইস্যুর কোনো সমাধান চাই। আর এই মুহূর্তে আমি সেটি ঘটতে দেখছি না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক হামলা ইরানের হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার সক্ষমতাকে যথেষ্ট মাত্রায় দুর্বল করতে পারবে না।

আইয়ারের ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেটাই করছে, যা তারা সবচেয়ে ভালো পারে। অর্থাৎ, সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে। কারণ সামরিক সক্ষমতায় আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, উপকূলীয় এলাকায় আমরা যতই হামলা চালাই না কেন, এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার ইরানের সক্ষমতাকে আমরা যথেষ্ট মাত্রায় দুর্বল করতে পারব না।’

তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের কাছে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র, অসংখ্য ড্রোন এবং ছোট ছোট আক্রমণাত্মক নৌযান রয়েছে, যেগুলো সহজেই সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইয়ার আরও বলেন, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যকে ভেঙে দিয়েছে।

তাঁর ভাষায়, ‘জুনের যুদ্ধ, এবং কিছুটা হলেও গত বছরের ঘটনাবলির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি জটিল ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছেন। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই জটিল ব্যবস্থার নতুন ভারসাম্য বা নতুন স্থিতাবস্থা খুঁজে পেতে সময় লাগবে। কত সময় লাগবে, আমি জানি না; সেটি কেমন হবে, তাও জানি না। তবে আমরা এটুকু জানি যে, এটি আর আগের মতো থাকবে না।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন এই আঞ্চলিক বাস্তবতা অনেক কম স্থিতিশীল হবে এবং ইরান আগের তুলনায় আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। আইয়ার মনে করেন, ভবিষ্যতে নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের বর্ধিত নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্যের কথাও তুলে ধরেন।

তাঁর ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজেদের ক্ষতি সীমিত করতে চায়, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চায় এবং এই সংকট থেকে সরে যেতে চায়, কারণ এটি একটি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল মনে করে, এই কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। তারা ইরানের বিরুদ্ধে আবারও হামলা শুরু করতে চায় এবং চায় যুক্তরাষ্ট্রও ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পুনরায় হামলা চালাক।’

আইয়ার আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং এতে একসঙ্গে বহু ভিন্ন ভিন্ন উপাদান কাজ করছে। তাঁর মতে, এই সংকটের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণ করবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই মৌলিক বিরোধের সমাধান হয় কি না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত