Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২

সেকশন

epaper
 
ভবিষ্যতের পৃথিবী

রাশিয়া কি খাদ্যে পরাশক্তি হয়ে উঠবে

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ১৬:৩২

রাশিয়ার বিস্তীর্ণ গমখেত। ছবি: রয়টার্স ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলো। তাতে বলা হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেবে। তত দিনে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ৯০০ কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য এখনকার চেয়ে আরও ৫০ শতাংশ বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। 

ভবিষ্যদ্বাণী করা হলো এই বলে যে, ওই দশকের (২০২০ থেকে ২০৩০) মাঝামাঝি নাগাদ পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষকে অনাহারে থাকতে হবে। তখন আর সাম্রাজ্য বিস্তার কিংবা আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যুদ্ধ হবে না, যুদ্ধ হবে খাদ্য নিয়ে। 

এবং কী আশ্চর্য! খাদ্য নিয়ে না হলেও ২০২০-৩০ দশকের প্রায় গোড়ার দিকে পৃথিবীতে একটি যুদ্ধ ঠিকই বেঁধে গেল। নিরাপত্তার অজুহাত (ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলে রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে) দেখিয়ে এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা করল রাশিয়া। ইউক্রেনও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। 

প্রায় তিন মাস ছুঁই ছুঁই, যুদ্ধ থামার নাম নেই। ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে, হাজার হাজার মানুষের হয়েছে প্রাণহানি। সমগ্র ইউক্রেন পরিণত হয়েছে বিশাল এক ধ্বংসস্তূপে। 

এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কোথায় ফুটবে সূর্যমুখী, কোথায় ফলবে ভুট্টা, কোথায়ই-বা আবাদ হবে গম? প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া যেখানে প্রধান কর্তব্য, সেখানে ফসল ফলানোর চিন্তা বিলাসিতা নয় কি? ফলে ইউক্রেন, যে দেশটি ‘পৃথিবীর রুটির ঝুড়ি’ বলে পরিচিত, সেই দেশে এখন প্রায় সব ধরনের ফসল উৎপাদন প্রায় বন্ধ। যুদ্ধের আগে যা কিছু উৎপাদন করে রেখেছিল, সেসবও বাইরের দেশে রপ্তানি করতে পারছে না। কারণ যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের সব বন্দর বন্ধ রয়েছে। 

রাশিয়া ইউক্রেন সংকট সম্পর্কিত খবর পেতে - এখানে ক্লিক করুন

এমন প্রেক্ষাপটে খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর ২০৩০ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। তার আগেই পৃথিবীতে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। এই তো গত বুধবার (১৮ মে) জাতিসংঘ বলেছে, ‘আমরা যদি যুদ্ধ থামাতে না পারি, তাহলে সামনের মাসগুলোতে খাদ্যের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’ 

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণে দরিদ্র দেশগুলো খাদ্যের সংকটে পড়তে পারে। যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো যদি ইউক্রেন তাঁদের পণ্য রপ্তানি পুনরায় শুরু করতে না পারে, তাহলে বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষ নেমে আসতে পারে, যা বছরের পর বছর স্থায়ী হতে পারে। এই সংঘাত লাখ লাখ মানুষকে অপুষ্টি, অনাহার ও দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে।’ 

২০২০ সালে ১ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি গম রপ্তানি করেছে রাশিয়া। ছবি: ওইসি উদ্ভূত পরিস্থিতির আঁচ পেয়ে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যে দেশজ উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু চাইলেই তো আর রাতারাতি আমদানি নির্ভরতা কমানো যায় না। পৃথিবীর ৩০ শতাংশ গমের চাহিদা পূরণ করত ইউক্রেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে ক্রেতা দেশগুলো বিকল্প দুই দেশ চীন ও ভারতের দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে ভারতে তীব্র দাবদাহে চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম পরিমাণ গম উৎপন্ন হওয়ায় দেশটি গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ভবিষ্যৎ খাদ্য সরবরাহ নিয়ে সংশয় আরও বেড়েছে। 

‘দেখি না, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়’ বলে যারা সমস্যাকে লঘু করতে চান, তাঁরাও সম্ভবত টের পাচ্ছেন যে, আরেকটি যুদ্ধ আসন্ন, এবং তা খাদ্যকে ঘিরেই। 

এখনই যেভাবে খাদ্যের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে যেতে শুরু করেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় খাদ্যটুকুও পরিণত হবে বিলাসী পণ্যে। যার পকেট স্ফীত থাকবে অর্থ-কড়িতে, তিনিই কেবল খেতে পারবেন। 

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইতিমধ্যে বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে খাদ্যসংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে। আমরা এখন যে আমদানি করা শস্য খাই, তা জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ফসল থেকে আসবে। 

ব্রিটিশ নাগরিক জে রেনার একজন টেলিভিশন উপস্থাপক এবং প্রখ্যাত খাদ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ফসলের খেতগুলো পরিত্যক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। তাই গম, ভুট্টা, বার্লির বৈশ্বিক উৎপাদন দিনকে দিন কমবে। একই কারণে (জলবায়ু পরিবর্তন) রাশিয়া হয়ে উঠবে খাদ্যে বৈশ্বিক পরাশক্তি। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমায়িত খাদ্যের চাহিদা ভয়ংকরভাবে বাড়বে। তখন রাশিয়ার দখলে থাকা বিশাল সাইবেরিয়ান প্রেইরি অঞ্চল খাদ্য উৎপাদনের জন্য উন্মুক্ত করবে রাশিয়া। 

জলবায়ু পরিবর্তন রাশিয়ার কপালে আশীর্বাদ হিসেবে নেমে এসেছে। সে কথা স্বীকার করে রাশিয়ার এক বিশিষ্ট কলাম লেখক লিওনিদ বারশিদস্কি বলেছেন, ‘বিশ্বের বৃহত্তম গম রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। দেশটির শস্য পরাশক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।’ 

গমখেতে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে রাশিয়া। ছবি: টুইটার ২০২০ সালে ১ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি গম রপ্তানি করেছে রাশিয়া। মার্কিন কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে রাশিয়া ৩ কোটি ৮৫ লাখ মেট্রিক টন গম রপ্তানি করছে। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশটি ৩ কোটি ৬৫ লাখ মেট্রিক টন গম রপ্তানি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে শুধু গম রপ্তানি থেকেই দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৪৫ কোটি ২০ লাখ ডলারে। 

রাশিয়া সবচেয়ে বেশি গম রপ্তানি করে মিসর, নাইজেরিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে। দেশটির রপ্তানি বাজার ক্রমশ বাড়ছে। দ্রুত বর্ধনশীল এ রপ্তানি বাজারের মধ্যে রয়েছে মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্ক। শুধু গমই নয়, ভুট্টা, বার্লি এবং ওটস রপ্তানির দিক থেকেও রাশিয়া এখন বিশ্বের এক নম্বর দেশ। 

২০১৫-১৬ সালের দিকে রাশিয়ার তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আলেক্সান্ডার তাকাচেভ বলেছিলেন, ‘তেল নয়, শস্য রপ্তানিতে বিশ্বে এক নম্বর দেশ হবে রাশিয়া। আমরা শস্য উৎপাদনে প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছি।’ সাত বছর পর তাকাচেভের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া এখন সত্যি সত্যিই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শস্য রপ্তানিকারক দেশ। 

জলবায়ু পরিবর্তন রাশিয়ার জন্য শাপে বর হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক খরা দেখা দিচ্ছে। ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে এই জলবায়ু পরিবর্তনই রাশিয়াকে এশিয়ার নতুন রপ্তানি বাজার দখল করতে সাহায্য করছে। 

কীভাবে সাহায্য করছে? জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রুশ কৃষকেরা তাদের খামারগুলো উত্তর দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উত্তরের বিস্তীর্ণ ভূমি বছরের পর বছর ধরে পতিত পড়ে ছিল, যে জমিগুলো আগে কখনো শস্য আবাদের জন্য ব্যবহৃত হয়নি। সেসব জমিতে এখন ফসল ফলানো হচ্ছে। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাশিয়া ৫ কোটি ৬৬ লাখ হেক্টর পতিত জমি পুনরুদ্ধার করেছে। সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে এই জমিগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এখন প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এই জমিগুলো চাষ উপযোগী করা গেছে। 

রাশিয়া তার দেশে ফলন বাড়াতে পশ্চিমা প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। ২০০৫ সাল থেকে কৃষিকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ ঘোষণা করেছে ক্রেমলিন। এর পর থেকে কৃষিতে অব্যাহতভাবে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে সরকার। রাশিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, সরকারি সমর্থন পেলে করপোরেশনগুলোর চেয়ে ছোট ছোট খামারগুলো দক্ষতার সঙ্গে অনেক বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ভূমি আইন সংস্কার করে ভূমির মালিকানা উদার করেছে রাশিয়া। এটিও দেশটির ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়। 

ইউক্রেনে অব্যাহত আগ্রাসন জারি রেখেছে রাশিয়া। এই যুদ্ধে ইউক্রেনের কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যদি নিতে পারে, তবে সেসব অঞ্চলের আবাদি জমিতে ফসল উৎপাদন বাড়াবে রাশিয়া, তা হলফ করে বলাই যায়। 

জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে কৃষিতে পশ্চিমা প্রযুক্তির ব্যবহার রাশিয়া, ইউক্রেন ও কাজাখস্তানের জন্য শস্য উৎপাদনে বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে। তবে এ সম্ভাবনার সবচেয়ে সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে রাশিয়া। তাই দেশটি ক্রমশ শস্যে পরাশক্তি হয়ে উঠছে। 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ব্লুমবার্গ, অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সটি (ওইসি) এবং এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল

বিশ্লেষণ সম্পর্কিত পড়ুন

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    পাকিস্তানের হাত দিয়ে মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীন

    রাশিয়ার পকেটে ইউক্রেনের ১৫ শতাংশ, কোন দিকে যাচ্ছে যুদ্ধ

    আপন বলয়ে অগ্নিপরীক্ষায় রাশিয়া

    চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছে আনছে ইউক্রেন সংকট

    রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর কী ঘটছে অস্ট্রেলিয়ায়

    ইউক্রেন কি আসলেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে

    অশান্ত সাগরে টহল কমের সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারীরা

    মাইক্রোর ওপর উঠে গেল বাস, নিহত ৬

    ইউএস-বাংলার আকর্ষণীয় অফার ‘হোটেল ফ্রি’

    পটিয়ায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক কৃষক নিহত

    ১২ হাজার কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

    সবাইকে ‘স্মারক উপহার’ দেবে সিলেট বিভাগীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন