Ajker Patrika

শৈশবের বন্ধু, দুজনেরই প্রাণ গেল নদীতে ডুবে

রংপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ১৮: ০৮
শৈশবের বন্ধু, দুজনেরই প্রাণ গেল নদীতে ডুবে
নদীতে ডুবে প্রাণ হারাল অহিদ ও মাসুদ। অহিদ কালো পাঞ্জাবি পরিহিত। দুজনে একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছিল। ছবি: সংগৃহীত

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নেমে দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কায়িশাবাড়ি এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

মৃত কিশোরেরা হলো অহিদ ইসলাম (১৫) ও মাসুদ রানা (১৬)। তারা দুজনেই জীবিকার তাগিদে ঢাকায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করত এবং ঈদুল আজহা উদ্‌যাপনের জন্য সম্প্রতি গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিল। এই অকাল মৃত্যুতে পরিবার দুটির একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো তেলিপাড়া গ্রাম।

অহিদ ও মাসুদের বাড়ি তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের ডাঙ্গীরহাট তেলিপাড়া গ্রামে। একই গ্রামে পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় শৈশব থেকেই তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব।

তবে অভাবের সংসারের হাল ধরতে কৈশোরেই তারা ঢাকায় পাড়ি জমায়। ঢাকায় ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় রাজমিস্ত্রির সহকারী বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটত। কঠোর পরিশ্রমের সেই আয়ের সিংহভাগই তারা পাঠিয়ে দিত গ্রামে অপেক্ষারত বাবা-মায়ের কাছে।

ঈদের ছুটিতে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ও পরিবারের সঙ্গে উৎসব কাটাতে তারা গ্রামে ফিরেছিল। ঈদের দিন তারা একসঙ্গে নামাজ আদায় করে এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উদ্‌যাপনের নানা পরিকল্পনা করে। কিন্তু ঈদের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই সেই আনন্দ রূপ নিয়েছে বুকফাটা কান্না আর শোকে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ সকালে অহিদ ও মাসুদ গ্রামের আরও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাশিয়াড়ি এলাকায় যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে যায়।

দুপুর ১২টার দিকে তারা নদীতে নামলে সাঁতার না জানা অহিদ ও মাসুদ রানা গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। তাদের ছটফট করতে দেখে সঙ্গে থাকা বন্ধুরা ও স্থানীয় লোজন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।

উদ্ধারের পর অহিদ ঘটনাস্থলেই মারা যায়। অন্যদিকে গুরুতর অবস্থায় মাসুদ রানাকে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সরেজমিনে তেলিপাড়া গ্রামে দেখা যায়, পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দুটি পরিবারের একমাত্র পুত্রসন্তানদের এমন অকাল মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

অহিদের মা কাজলী বেগম ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। চেতন ফিরলেই প্রলাপ বকছেন, ‘বাবা মাসুদ (অহিদ) ! তুই হামাক ছাড়ি কই গেলু? মোর বুকটা কেন খালি করলু? মুই তোক ছাড়ি বাঁচিম কেমন করি! তুই আর ঢাকা যাবু না...।’

অন্যদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছেন মাসুদ রানার বাবা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একটাই ছেলে আমার। ছেলেকে নিয়ে আমরা ঢাকাতেই থাকতাম। কোরবানির ঈদ করতে গ্রামে আসছিলাম। আমার বাবাটাকেই কোরবানি দিয়ে দিতে হলো। আল্লাহ যেন আমার বাবাকে বেহেশত নসিব করেন। সবাই আমার বাপের জন্য দোয়া করবেন।’

প্রতিবেশী জুয়েল বাবু বলেন, ‘ছেলে দুটি খুব নম্র আর ভদ্র ছিল। অভাবের কারণে তারা কিশোর বয়সেই ঢাকায় কঠোর পরিশ্রম করত। ঈদের আনন্দ করতে গিয়ে এভাবে চলে যাবে, তা ভাবতেই পারছি না। তারা দুজনেই ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে।’

তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত চিকিৎসক হাসান আল মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নদীতে ডুবে যাওয়া মাসুদ রানা নামের এক কিশোরকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়।

তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘ইউপি সদস্যের মাধ্যমে আমরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খবর পাই এবং তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাই। বেলা ১টার দিকে একজনের ও দেড়টার দিকে অপরজনের মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে এবং মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া চলমান।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত