
ঘাস-পাতা খেয়ে থাকব, না খেয়ে থাকব, তবু আমরা নিজস্ব পারমাণবিক বোমা তৈরি করব—১৯৭৪ সালে ভারতের ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ পারমাণবিক পরীক্ষার পর এই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বে ইতিমধ্যে ‘খ্রিষ্টান বোমা, ইহুদি বোমা এবং এখন একটি হিন্দু বোমা’ তৈরি হয়েছে, তাহলে একটি ‘ইসলামিক বোমা’ কেন নয়—ভুট্টোর এই একটি প্রশ্নই পরবর্তী এক দশকের মধ্যে পাল্টে দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ভুট্টোর এই আকাঙ্ক্ষা ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও হাত মেলাতে বাধ্য হয়েছিল ইসরায়েল ও ভারত। কারণ, উভয় দেশই ছিল পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্টের প্রধান দুই কৌশলগত শত্রু। উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয় আরও পরে, ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের আমলে।
পরমাণু শক্তিধর তিন দেশ ভারত, ইসরায়েল ও পাকিস্তান সে সময় এক গোপন ও রোমাঞ্চকর সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়েছিল। ইসরায়েলের ভয় ছিল, পাকিস্তান খুব দ্রুত একটি ‘ইসলামিক বোমা’ তৈরি করতে যাচ্ছে। এই আতঙ্ক এতটাই তীব্র ছিল যে, মোসাদ ভারতের ‘র’-এর সঙ্গে মিলে পাকিস্তানের মূল পারমাণবিক কেন্দ্র কাহুতাতে একটি যৌথ বিমান হামলার ছক কষেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই অপারেশন বাতিল করে দেন।
অনেকের মতে, ওয়াশিংটনের কঠোর হুমকির মুখে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন। পরে ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, যা আজ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও এক বড় ছায়া ফেলছে। কারণ, ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’র মাধ্যমে ইসলামাবাদ রিয়াদের ওপর তার পারমাণবিক ছত্রচ্ছায়া প্রসারিত করেছে।
২০২৬ সালে এসে সেই কাহুতা কাহিনি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করতে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই চুক্তি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ইসলামাবাদের নীতি স্পষ্ট—ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান ছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে পাকিস্তান হলো এমন এক পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র, যারা তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
চার দশকের চরম অবিশ্বাস, আদর্শিক ভিন্নতা ও প্রচ্ছন্ন শত্রুতার ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ট্রাম্পের এই হাত মেলানোর চেষ্টা কতটা বাস্তবসম্মত, তা বুঝতে ১৯৮০-এর দশকের সেই রোমহর্ষক কাহুতা অপারেশন সম্পর্কে জানা জরুরি।
১৯৭০-এর দশকে পরমাণুবিজ্ঞানী আবদুল কাদির খানের (ড. এ কিউ খান) নেতৃত্বে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দেশটির সামরিক জান্তা একটি ‘ইসলামিক গর্ব’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ উদ্বিগ্ন ছিল, পাকিস্তান একবার এই প্রযুক্তি অর্জন করলে তা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য শত্রু রাষ্ট্রগুলোর হাতেও পৌঁছে যেতে পারে। ভারতের উদ্বেগও কম ছিল না।
১৯৭০-এর দশকেই আর এন কাওয়ের নেতৃত্বে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্টরা কাহুতা ল্যাবরেটরিতে অনুপ্রবেশ করে বিজ্ঞানী এ কিউ খানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছিলেন (যাঁকে সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা জেমস ললার ‘মার্চেন্ট অব ডেথ’ বা মৃত্যুর সওদাগর বলে আখ্যা দিয়েছিলেন)।
১৯৮১ সালের জুনে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করে দেয়। এর পরপরই ভারতের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি কমিটি পাকিস্তানেও একই ধরনের ‘ওসিরাক কন্টিজেন্সি’ বা আকস্মিক হামলার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এতে সম্মতি দিলে এয়ার মার্শাল দিলবাগ সিংকে এর অপারেশনাল পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভারত কার্নাডের ২০১৬ সালের একটি নিবন্ধে এই অভিযানের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। পরিকল্পনা ছিল—ইসরায়েলের ছয়টি এফ-১৬ ও ছয়টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান হাইফা থেকে উড়ে এসে গুজরাটের জামনগরে অবতরণ করবে।
সেখানে ক্রু মেম্বাররা বিশ্রাম নিয়ে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবেন। এরপর বিমানগুলো জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুরে যাবে, যেখানে ইসরায়েল থেকে আনা বিশেষ পেনিট্রেশন বোমা (বাংকার-বাস্টার) আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হবে। এরপর পাকিস্তানি রাডার এড়াতে যুদ্ধবিমানগুলো পাহাড়ি উপত্যকার আড়াল দিয়ে উড়ে কাহুতায় অতর্কিত বোমাবর্ষণ করবে।
তবে ইসরায়েলের একটি শর্ত ছিল; তারা চেয়েছিল ভারত যেন এই অভিযানে প্রকাশ্যে অংশ নেয়, যাতে পরে দায় এড়াতে না পারে।
(উল্লেখ্য, ইন্দিরা গান্ধীর দুই মেয়াদের মাঝে ভারতে ক্ষমতায় আসা জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই একবার পাকিস্তানি সেনাশাসক জেনারেল জিয়া-উল-হককে ফোনে জানিয়েছিলেন, ভারত কাহুতার গোপন তৎপরতা সম্পর্কে জানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই একটি তথ্যের কারণে কাহুতায় নিয়োজিত ‘র’-এর বহু গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ট ও নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরে জিয়া-উল-হক মোরারজি দেশাইকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার দিয়েছিলেন)।
ইরাকের ওসিরাক চুল্লিতে হামলা চালানো সহজ হলেও পাকিস্তানের কাহুতায় হামলার সমীকরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপজ্জনক। পাকিস্তান ইতিমধ্যে পাল্টা আঘাতের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মুনির আহমদ খান ভিয়েনায় ভারতীয় বিজ্ঞানী রাজা রামান্নাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কাহুতায় আঘাত করা হলে পাকিস্তান মুম্বাইয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছে অবস্থিত ভারতের ট্রম্বে পারমাণবিক কেন্দ্রে পাল্টা হামলা চালাবে। এর ফলে ভারতের বাণিজ্য নগরীতে এক ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা ছিল।
দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় বাধাটি ছিল ওয়াশিংটন। তৎকালীন সময়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের কারণে জেনারেল জিয়া-উল-হকের পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রন্টলাইন বা প্রধান মিত্র। ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান কোনোভাবেই পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা চাননি।
২০২৫ সালে বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা রিচার্ড বার্লো বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে ইন্দিরা গান্ধী এতে সই করেননি...এটি করা হলে বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। তবে ইসরায়েল যদি এই হামলা চালাত, রিগ্যান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিনের ওপর ক্ষুব্ধ হতেন, কারণ, এটি মার্কিন আফগান নীতিকে সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত করত।
ডিসিপশন: পাকিস্তান, দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অ্যান্ড দ্য সিক্রেট ট্রেড ইন নিউক্লিয়ার উইপনসের লেখক আদ্রিয়ান লেভি ও ক্যাথরিন স্কট-ক্লার্কের মতে, শেষ মুহূর্তে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সম্ভাব্য এই হামলার বিষয়ে জেনারেল জিয়াকে গোপনে সতর্ক করে দেয়। ফলে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কায় ইন্দিরা গান্ধী এই অপারেশন থেকে সম্পূর্ণ পিছিয়ে আসেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভারত কার্নাড লিখেছেন, এটিই ছিল পাকিস্তানের পারমাণবিক চৌকাঠ পার হওয়া ঠেকানোর ভারতের শেষ বিশ্বাসযোগ্য সুযোগ। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী শেষ মুহূর্তে সাহস হারিয়ে ফেলেন। পরে ১৯৮৪ সালে রাজীব গান্ধীর আমলেও এমন একটি একক ভারতীয় মিশন চালুর পরিকল্পনা করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
পরে এ কিউ খানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই পারমাণবিক প্রযুক্তি ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ঠিক চার দশক পর, যে ওয়াশিংটন একসময় পাকিস্তানকে বাঁচাতে ভারতকে চাপ দিয়েছিল, সেই ওয়াশিংটনই আজ ট্রাম্পের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে পাকিস্তানকে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলাতে বাধ্য করছে। তবে চার দশক আগের কাহুতার ইতিহাস স্পষ্ট করে দেয়, দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা ও অবিশ্বাসের শিকড় কতটা গভীরে।
ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত সাংবাদিক সুশীম মুকুলের লেখাটি সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের সুনিয়ন্ত্রিত ও সুরক্ষিত দুর্গে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) টানা দেড় দশকের আক্রমণ সামলে যে তৃণমূল এত দিন নিজেদের ‘অপরাজেয়’ হিসেবে জাহির করে আসছিল, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সেই দেয়াল ধসে পড়তে...
৭ ঘণ্টা আগে
ভারতের উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নেওয়ার মুখে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২ দিন আগে
ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে হয়তো জয়ী হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; কিন্তু ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ওপর হামলার তিন মাস পর এখন একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে—ট্রাম্প কি আসলে এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন?
৪ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দুই পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি স্থায়ীভাবে কার্যকর করতে প্রস্তাবিত এই চুক্তির বিভিন্ন শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
৫ দিন আগে