Ajker Patrika

পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তির পরামর্শ বিশিষ্টজনদের

বাসস, ঢাকা  
আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ১২: ১৭
পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তির পরামর্শ বিশিষ্টজনদের
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ছবি: বাসস

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত নিবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষা ও ইতিহাসবিদসহ বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলছেন, এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারবে।

১৯৭২ সালে প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এই নিবন্ধ প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে একই পত্রিকার সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখাটি পুনর্মুদ্রণ করা হয়।

আগামীকাল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁর জীবন-কর্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতি গঠনে তাঁর অসামান্য অবদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে তাঁর ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটি পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করতে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশিষ্টজনেরা।

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক নিবন্ধটিকে একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি চমৎকার লেখা এবং ঐতিহাসিক দলিল। এটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনও ফজলুল হকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, অবশ্যই, এটি অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। দিন দিন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য এই নিবন্ধ পাঠ্যপুস্তকের অংশ হওয়া উচিত।

আরও কয়েকজন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ বলেছেন, প্রবন্ধটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে ঐতিহাসিক নানা বিষয় জানতে পারবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি নিবন্ধটি পড়েছি। এটি অত্যন্ত তথ্যবহুল লেখা। এতে বিভ্রান্তিকর কিছু নেই। এটি বাংলাদেশ স্টাডিজ সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।’

ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ড. মো. ইসরাফিল বলেন, ‘নিবন্ধটি প্রকাশের পর মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পটভূমি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলার কারণে এটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।’ তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের এই ইতিহাস সম্পর্কে জানা উচিত।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার পরপরই তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সে সময় তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন।

‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধটি যখন প্রকাশ হয়, সে সময় জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তখন তাঁর র‍্যাঙ্ক ছিল মেজর জেনারেল। ১৯৭১ সালের একজন জ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি এই পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। জিয়াউর রহমান এই দিনটিকে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধে ‘বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানত। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এই আদেশ মেনে নিল।’

জিয়াউর রহমান উল্লেখ করেন, এরপর তিনি সেনাদের নিয়ে বন্দরনগরীর উপকণ্ঠ কালুরঘাট এলাকায় চলে যান।

ইতিমধ্যে বাঙালি বেতারকর্মীরা সেখানে একটি অস্থায়ী ও গোপন ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ স্থাপন করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

স্মৃতিচারণা নিবন্ধটিতে জিয়াউর রহমান ছাত্রজীবন এবং সৈনিক জীবনের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতার আলোকে পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক দমনপীড়ন এবং রাজনীতিতে কোণঠাসা করে রাখার কথাও তুলে ধরেন। বিশেষ করে দীর্ঘ সামরিক শাসনের ভয়াবহতার কথা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি লেখেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর জনাব জিন্নাহ (পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা) তাঁর ঐতিহাসিক ঢাকা সফরে ঘোষণা করছিলেন, “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” আমার মতে সেদিন থেকেই বাঙালিদের হৃদয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ বপন হয়।’

জিয়াউর রহমান তাঁর লেখায় আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই সেদিন ঢাকায় এই অস্বাভাবিক দেশটির ধ্বংসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন।’ তাঁর মতে, পাকিস্তানি জান্তার কর্মকাণ্ডই বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধকে অপরিহার্য ও অনিবার্য করে তুলেছিল।

নিবন্ধে জিয়াউর রহমান তাঁর নিজের মনে গভীর রেখাপাত করা প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে বিবরণ দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন; ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন; আইয়ুব খানের সামরিক শাসন; ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ; ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন।

পাকিস্তানি শাসকদের ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা, বাঙালিদের প্রতি অবমাননাকর মনোভাব এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের পদক্ষেপ; এসবই বাঙালিদের শেষ পর্যন্ত মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছিল বলেও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন জিয়া। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও সুসংহত করেছিল।

জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘ওই মামলার পরিণতি (শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তিলাভ) বাঙালি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলে...তারা বাঙালি (বেসামরিক) জনগণের সঙ্গেও সংহতি প্রকাশ করে।

‘১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানি শাসকদের জন্য ছিল বড় এক ধাক্কা। ক্ষমতা হস্তান্তরে তাদের টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ফলে ১৯৭১ সালের মার্চে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।’

জিয়াউর রহমান লিখেছেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন গোপনে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করতে শুরু করে। আর সেই প্রেক্ষাপটেই শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।

নিবন্ধে আরও বলা হয়, ‘রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের কাছে “গ্রিন সিগন্যাল” হিসেবে এসেছিল। এরপর আমরা আমাদের পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ দিলাম...তারপরই নেমে এল ২৫ ও ২৬ মার্চের কালরাত।’

জিয়া উল্লেখ করেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালায়। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তগুলোই বাঙালিদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে পরিণত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে জিয়া প্রথমে একটি সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন এবং পরে তাঁর অধীনে থাকা ইউনিটটি ‘জেড ফোর্স’ নামক একটি ব্রিগেড আকারের বাহিনীতে রূপ নেয়।

১৯৭১ সালের অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক জেনারেল জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি রাজনীতিতে এক নতুন মোড় আনেন এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’- এর প্রবর্তন করেন, যা ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় পরিচয় এবং বহু-সাংস্কৃতিক নাগরিকত্বকে ধারণ করে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি বহুদলীয় ও সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেন, একদলীয় বাকশাল শাসন বাতিল করেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন, যাতে সব শ্রেণি, পেশা, জাতি ও ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ এগিয়ে যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত