Ajker Patrika

‘ছেলেরা বার বার হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়েছিল, কথা হয়নি’ গোফফার প্রামানিকের কাছে নেই কোন সান্ত্বনা

রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
‘ছেলেরা বার বার হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়েছিল, কথা হয়নি’ গোফফার প্রামানিকের কাছে নেই কোন সান্ত্বনা
রিয়াদে কারখানায় আগুনে নিহত ১১ জনই আত্রাইয়ের। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা কারখানায় আগুনে নিহত ১৬ জনের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁর আত্রাইয়ের গন্ডগোহালী গ্রামের গোফফার প্রামানিকের দুই ছেলে মোহন ও সুমন। গতকাল রোববার রাতে তাঁদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তিনি। পরে নিজের ফোন চেক করে দেখেন, ইমো আর হোয়াটসঅ্যাপে দুই ছেলের অসংখ্য মিসড কল।

আজ সোমবার গোফফার প্রামানিক এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘যখন কারখানায় আগুন ধরে, তখন ছেলেরা শেষ বারের মতো আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বারবার ইমু/হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেছিল। কিন্তু আমাদের এখানে বিদ্যুৎ না থাকায় নেট পায়নি। ফলে সরাসরি কথা হয়নি। তবে ভয়েস মেসেজে তারা আকুতি করে বলেছে, তোমরা আমাদের জন্য দোয়া করো। তোমাদের সঙ্গে হয়তো আর কথা হবে না। কারখানায় আগুন ধরেছে, দরজা খোলা যাচ্ছে না। হয়তো আমরা সবাই মারা যাব।’

শেষ বারের মত ছেলেদের সঙ্গে একটু কথাও বলতে পারলেন না, এই আফসোস পিছু ছাড়ছে না গোফফার প্রামানিকের। বুক জুড়ে হাহাকার নিয়ে বলেন, ‘আমি আর ছোট ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। মোহন আর সুমনের আয়ের ওপর নির্ভর করে আমাদের সংসার চলত। সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ৮ বছর আগে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি পাঠিয়েছিলাম। এরপর সুমনকে ২ বছর আগে মোহনের কাছে পাঠিয়েছি। তারা বলেছে, ‘‘গ্রামে বাসা নির্মাণ করেন। বাসার কাজ শেষ হলে দুই ভাই একসঙ্গে এসে বিয়ে করব।’’ গত বুধবার বাসার কাজ শুরু করেছি। রোববার এক খবরে আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

গন্ডগোহালী গ্রামের আরেক সন্তান রুবেল। ছুটিতে দেশে এসে কয়েক মাস আগে আবার ফিরে যান কর্মস্থলে। মাত্র ১৪ দিন আগে আয়েশা জান্নাতি নামে এক কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছে সে।

‘রুবেল তার একমাত্র মেয়েকে শুধু মোবাইলে দেখেছে। কন্যাকে বুকে জড়াতে বার বার বাড়িতে আসার কথা বলছিল সে। কিছু দিন পরেই তার বাড়িতে আসার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে ছেলেটা চলে গেল।’ আর্তনাদ করে উঠলেন রুবেলের অসহায় বাবা সাইদুর রহমান।

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানোদের মধ্যে আরও আছে গন্ডগোহালী গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দীন, ডুবাই গ্রামের বাদল তালুকদারের ছেলে সোহেল রানা ওরফে সুমন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক, পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ সরদারের ছেলে জলিল সরদার, মাধবপুর গ্রামের মুজনু সরদারের ছেলে মজিদুল সরদার সজিব, উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে ফরিদ উদ্দীন এবং সাধনগর গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে সাগর আলী।

মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, ‘৮ বছর আগে ছেলেকে বিদেশ পাঠাই। সেখানে যাওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যায়। ফলে দীর্ঘদিন কাজ করতে পারেনি। কিছু দিন হলো কাজ করা শুরু করেছে। এরই মধ্যে আমার ছেলেটা শেষ হয়ে গেল।’

ডুবাই গ্রামের নিহত সোহেল রানা ওরফে সুমনের বোন সুবর্ণা আক্তার বলেন, ‘বাবার শেষ সম্বল দেড় বিঘা জমি আর মায়ের শখের গহনা বিক্রি করে ভাইকে বিদেশ পাঠানো হল। এর কিছু দিন পরেই বাবা মারা যান। দেড় বছর আগে ভাই বিদেশ থেকে এসে বিয়ে করে। বর্তমানে তার ৮ মাসের পুত্রসন্তান রয়েছে। এখন কিভাবে সংসার চলবে আর এই সংসার কে দেখাশোনা করবে, ভেবে পাচ্ছিন।’

নিহতদের স্বজনরা দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আকুতি জানিয়েছেন।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান আত্রাইয়ের ১১ জন নিহতের খবর নিশ্চিত করে বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাত থেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে সান্ত্বনা দেওয়াসহ খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আপাতত নিহতদের প্রতি পরিবারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া সরকারিভাবে প্রতি পরিবারকে আরও ৩ লাখ টাকা করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং অন্যান্য বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করতে চেষ্টা করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত