Ajker Patrika

যুবদলের দুই নেতার নিয়ন্ত্রণে মেঘনায় চলছে মাছের পোনা ধ্বংসযজ্ঞ

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি 
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ১১: ০০
যুবদলের দুই নেতার নিয়ন্ত্রণে মেঘনায় চলছে মাছের পোনা ধ্বংসযজ্ঞ
বিশেষ কায়দায় জোয়ার-ভাটার গতিপথে অবৈধ ’খচ্ছি জাল’ পেতে নির্বিচারে মৎস্য সম্পদ নিধন করা হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনা নদীতে স্থানীয় যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিন ও মো. কবির হোসেনের নিয়ন্ত্রণে নির্বিচারে মৎস্য নিধন চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মদদে অবৈধ ‘খচ্ছি জাল’ ব্যবহার করে প্রতিদিন মণকে মণ জাটকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা মারা পড়ছে। এর ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য ও ইলিশের অভয়াশ্রম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, যুবদল নেতা হেলাল সাহেবের হাট ও মাতাব্বর হাট এলাকায় একটি জেলে বাহিনীকে মদদ দেন। অভিযুক্ত হেলাল সাহেবের হাট ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য। এই বাহিনী বিশেষ কায়দায় জোয়ার-ভাটার গতিপথে অবৈধ ‘খচ্ছি জাল’ পেতে নির্বিচারে মৎস্য সম্পদ নিধন করছে।

মতিরহাট এলাকায় যুবদল নেতা মো. কবির হোসেন এই অবৈধ কাজের নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি উপজেলা যুবদলের সদস্য। কালকিনি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেক নিশ্চিত করেন যে আক্কাস মাঝির নেতৃত্বে যে পাঁচটি নৌকায় মাছ ধরা হয়, তার পুরো নিয়ন্ত্রণ কবিরের হাতে। তিনি বলেন, তাদেরকে দিয়ে চুক্তিতে মাছ ধরানো হয় এবং প্রশাসনিক সকল ‘টেবিল ম্যানেজ’ করেন কবির।

মেঘনা নদীতে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। মাতাব্বর হাটসহ আশেপাশে জেগে ওঠা চরে পাতা হয়েছে অবৈধ খচ্ছি জালের ফাঁদ। যত দূর চোখ যায়, খুঁটি আর জালে ঘেরা সেই দৃশ্য। বিস্তীর্ণ চরের চারপাশে মাটিতে পোঁতা হয়েছে শত শত খুঁটি, যার সঙ্গে বাঁধা রয়েছে মশারি জালের মতো বিশেষ জাল।

জোয়ারের সময় এই ফাঁদ পাতা জাল ডুবে যায়। কিন্তু ভাটা শুরু হতেই যখন চরের পানি নেমে যেতে থাকে, তখন জালগুলোতে আটকা পড়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এ সময় মণকে মণ মাছের পোনা ও জলজ উদ্ভিদ নির্বিচারে ধ্বংস হয়।

কমলনগরের মেঘনা নদী ইলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভয়াশ্রম। এখানেই মা ইলিশ ডিম ছাড়ে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বেড়ে ওঠার আগেই খচ্ছি জালের ফাঁদে আটকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ইলিশের সেই পোনাগুলো। এই ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলে সরকারের ‘মা ইলিশ রক্ষা’ এবং ‘জাটকা রক্ষা অভিযান’ কোনোভাবেই সফল হবে না। দিনি দিন ইলিশসহ মাছের উৎপাদন কমতে থাকবে।

জালে আটকা পড়া জাটকা। ছবি: আজকের পত্রিকা
জালে আটকা পড়া জাটকা। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার চরজুড়ে এই অবৈধ জালের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এই ফাঁদে আটকা পড়া বড় মাছ জেলেরা সংগ্রহ করলেও বাকি মাছের পোনাগুলো চরের কাদামাটিতে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মাছঘাট দখল ও চাঁদাবাজির কারণে হেলালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও পরে তিনি ‘রহস্যজনকভাবে’ নিজ পদে ফিরে আসেন এবং এর পর থেকে আরও বেপরোয়াভাবে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, এই যুবদল নেতারা মোটা অঙ্কের টাকায় বিভিন্ন টেবিল ম্যানেজ করে এসব করছেন। সাধারণ জেলেরা জানিয়েছেন, ‘নেতারা দল ও গায়ের জোরে নদীতে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ মারছেন। আমরা ভয়ে মুখ খুলতে পারছি না। প্রতিবাদ করলে বিপদ।’

অবৈধ জালে মাছ ধ্বংসের বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদল নেতা হেলাল মেম্বার সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে পরে একজন কথা বলবে।’ যুবদল নেতা কবির হোসেন তাঁর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কোনো মাছের ব্যবসা করি না, আমি কিছুই জানি না।’

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তূর্য সাহা বলেন, ‘আমি ছুটিতে ছিলাম। এসেই বিষয়টি জানতে পেরে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়েছি। এরই মধ্যে জালের বেশ কিছু খুঁটি অপসারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আবারও অভিযান দিয়ে পুরোটা অপসারণ করা হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন, ‘যুবদল নেতার বিষয়ে অভিযোগ শুনেছি। মৎস্য কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

সচেতন মহল অবিলম্বে এই অবৈধ খচ্ছি জাল বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাবে এবং সরকারের মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা রক্ষা অভিযান সফল হবে না। মৎস্য খাতকে রক্ষায় এই চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত