Ajker Patrika

২০ টন সরকারি চাল জব্দ

দায়িত্বশীলেরাই মামলার বাদী-সাক্ষী, আসামি হলেন ট্রাকচালক-হেলপার

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
আপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ২২: ২২
দায়িত্বশীলেরাই মামলার বাদী-সাক্ষী, আসামি হলেন ট্রাকচালক-হেলপার
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা দুলাল মিয়া ও গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম। ছবি: সংগৃহীত

নেত্রকোনার মদনে ৬৬৭ বস্তায় প্রায় ২০ টন সরকারি চাল ট্রাকে করে পাচারের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। তবে মামলার বাদী ও সাক্ষী হয়েছেন অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাদ্য বিভাগের দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা। আর আসামি করা হয়েছে ট্রাকচালক, হেলপার ও স্থানীয় এক ব্যবসায়ীকে। এ নিয়ে এলাকার সচেতন মহলে ব্যপক সমালোচনা হয়েছে।

এদিকে জব্দ করা চালগুলো সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ না করে এত দিন মজুত রাখার অভিযোগের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কেউই সদুত্তর না দিয়ে নানা যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খাদ্য বিভাগ তাদের দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা করছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে মদন উপজেলার নেত্রকোনা-মদন সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে চালভর্তি ট্রাকটি জব্দ করে প্রশাসন। এ সময় ট্রাকচালক ও হেলপারকে আটক করা হয়। আজ শুক্রবার সকালে এই ঘটনায় মদন থানায় মামলা দায়ের হয়েছে।

মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার বাদী হয়েছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুলাল মিয়া। সাক্ষী হিসেবে নাম রয়েছে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলমের।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের বরাদ্দ খাদ্যদ্রব্য হিসাব অনুযায়ী গুদামে সংরক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও গুদাম কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত থাকে। তাঁদের অনুমতি বা অগোচরে বিপুল পরিমাণ চাল গুদাম থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও গুদাম কর্মকর্তার যোগসাজশেই দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাল নিয়ে অনিয়ম চলছিল। এখন নিজেদের দায় এড়াতে ট্রাকচালক ও হেলপারকে ফাঁসানো হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্পের (কাবিখা ও জিআর) আওতায় বরাদ্দ পাওয়া চাল মদন উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে প্রকল্প সভাপতি বা ডিও হোল্ডারদের কাছে সরবরাহ করা হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম প্রকল্প সভাপতি ও ডিও হোল্ডারদের কাছে ৬৬৭ বস্তায় প্রায় ২০ টন সরকারি চাল বুঝিয়ে দেন। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা।

এজাহারে আরও বলা হয়, পরে গুদাম কর্মকর্তা জরুরি কাজে আঠারবাড়ি, ঈশ্বরগঞ্জে চলে গেলে ট্রাকচালক শামীম, হেলপার শাহীন ও স্থানীয় ব্যবসায়ী এনামুল হক আনার যোগসাজশে চালগুলো বারহাট্টা উপজেলার বাউসী এলাকার তালুকদার অটোরাইস মিলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে নেত্রকোনা-মদন সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে চালবোঝাই ট্রাকটি আটক করে প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করে।

এই ঘটনায় ট্রাকচালক শামীম (৩০), চালকের সহযোগী মো. শাহীন (৩৫) ও ব্যবসায়ী মো. এনামুল হক আনারকে (৬০) আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার পর নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘টিআর-কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের চালের ডিও গত এপ্রিল মাসেই শেষ হয়েছে। চলতি মে মাসে এসব প্রকল্পে কোনো ডিও (চাহিদাপত্র) নেই। এ ছাড়া এসব প্রকল্পে সাধারণত দেড় থেকে দুই টনের বেশি চাল বরাদ্দ হয় না। সেখানে একসঙ্গে ২০ টন চাল ট্রাকে করে নেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ডিওর চাল তিন দিনের মধ্যে গুদাম থেকে উত্তোলন করতে হয়। মূলত টিসিবি ও বিভিন্ন প্রকল্পের চাল কিনে দীর্ঘদিন ধরে গুদামে মজুত করা হচ্ছিল। সেই চালই পাচারের চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

মদন শহরের বাসিন্দা ফয়েজ মিয়া বলেন, ‘গুদামে দীর্ঘদিন প্রকল্পের ডিওর চাল রাখার নিয়ম নেই। এটা গুদাম কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয়। তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে এত বড় অনিয়ম হওয়ার কথা নয়।’

হতাশা প্রকাশ করে ফয়েজ মিয়া বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই হয়ে গেলেন বাদী-সাক্ষী। সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

তবে মামলার বাদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুলাল মিয়া চাল জব্দের কথা জানলেও কোথা থেকে এই চাল এসেছে, তা জানেন না বলে দাবি করেছেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘চাল জব্দ হয়েছে শুধু এটা জানি। এসব চাল গুদামের নাকি অন্য কোথাকার, সেটা জানি না। গুদাম কর্মকর্তার কথামতো থানায় অভিযোগ দিয়েছি। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানি না। মামলা হয়েছে, তদন্তে সব বের হবে।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গুদামে কোনো প্রকল্পের চাল আটকে ছিল না। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।’

তবে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলমের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবারই জব্দ চালের ডিও অনুমোদন হয়েছে দাবি করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাওলিন নাহার বলেন, ‘প্রকল্পের চাল ডিও হোল্ডারদের গতকাল বৃহস্পতিবার গুদাম থেকে দেওয়া হয়েছে। পরে সেগুলো পাচার করে দেওয়া হচ্ছিল। খবর পেয়ে সেগুলো জব্দ করা হয়। জব্দের ঘটনায় মামলা হয়েছে।’

চলতি মে মাসে কোনো প্রকল্পের ডিও অনুমোদন না হলেও বৃহস্পতিবার চাল বিতরণ হলো কীভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বিষয়টা খাদ্য বিভাগ তদন্ত করবে।’

খাদ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ থাকলেও তাঁরা আসামি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার শাওলিন নাহার বলেন, ‘এটিও খাদ্য বিভাগ তদন্ত করে বের করবে।’

এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমান প্রথমে নানা যুক্তি দিয়ে খাদ্য কর্মকর্তাদের নির্দোষ দাবি করলেও একপর্যায়ে বলেন, ‘চলতি মাসে এসব প্রকল্পের চালের কোনো ডিও হয়নি। গত এপ্রিলের ডিও হওয়া চাল গুদামে রেখে দেওয়া হয়েছিল। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা চাল নিতে দেরি করেন, তখন তো আর জোর করে তাঁদের দেওয়া যায় না। তাই গত মাসের চালই গতকাল দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টা অনিয়ম হলেও অনেক সময় নানা কারণে সেটা করতে হয়।’

ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে এই জেলা কর্মকর্তা বলেন, ‘এই ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তে তাঁদের (উপজেলা কর্মকর্তারা) বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে, পুলিশও তদন্ত করবে। যোগসূত্র পেলে তারাও ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

মামলার বিষয়ে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মদন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুলাল মিয়ার লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়মিত মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামিকে শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জিন ছাড়ানোর নামে ২১টি যৌন নিপীড়ন, লন্ডনে বাংলাদেশি ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের ১৫ আমল

‘সনাতন ধর্ম নির্মূল করতে হবে’, তামিলনাড়ু বিধানসভায় এমএলএর মন্তব্যে বিতর্ক

স্ত্রীর পরকীয়ায় স্ট্যাটাস দিয়ে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা

ব্যাংক ম্যানেজারকে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় শেষে মহাসড়কে ফেলে দিল দুর্বৃত্তরা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত