Ajker Patrika

‘চিনিগুঁড়া’ বলে কম দামে সুগন্ধিযুক্ত মোটা চাল বিক্রির অভিযোগ, প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতা

অরূপ রায়, সাভার
‘চিনিগুঁড়া’ বলে কম দামে সুগন্ধিযুক্ত মোটা চাল বিক্রির অভিযোগ, প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতা

দেশের বাজারে এক মাসের ব্যবধানে সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। যে চাল গত মাসেও ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৩০ টাকায়। চালের এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বিপদে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। আর সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র।

দেশের অন্যতম বড় পাইকারি চালের বাজার ঢাকার সাভারের নামাবাজার। এখানে তিন শতাধিক ছোট-বড় ব্যবসায়ী চালের বেচাকেনা করেন। সাভার ছাড়াও আশপাশের একাধিক জেলার বাজারে এই মোকাম থেকে চাল সরবরাহ করা হয়। নামাবাজারে অন্যান্য চালের সঙ্গে বিক্রি করা হচ্ছে বিশেষ মেশিনে কেটে আকারে ছোট করা কম দামের সুগন্ধিযুক্ত মোটা চাল। বিশেষ মেশিনে ছোট করা এই চালে বিক্রির আগে মেশানো হয় কৃত্রিম সুগন্ধি পাউডার। পরে আকর্ষণীয় মোড়কে ‘চিনিগুঁড়া চাল’ লিখে এগুলো বাজারজাত করা হয়। বাহ্যিকভাবে তীব্র সুগন্ধ থাকায় সাধারণ ক্রেতারা এটিকেই আসল চিনিগুঁড়া চাল মনে করে কম দামে পেয়ে বেশি কিনছে এবং প্রতারিত হচ্ছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, একদিকে রজনীগন্ধা, এরফান, সাগর, আকিজ, পুষ্টি, তীরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বাবুর্চি, দাওয়াত, ডায়মন্ডসহ বিভিন্ন নামে প্যাকেটজাত কম দামের চালও একইভাবে ‘চিনিগুঁড়া’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন গুদামঘরে ও মিলে প্যাকেটজাত এসব চালের বড় অংশই প্রকৃত চিনিগুঁড়া নয়। কম দামের মোটা চালকে কেটে চিনিগুঁড়ার মতো আকার দেওয়া হয়। এরপর তাতে কৃত্রিম সুগন্ধি পাউডার মিশিয়ে বাজারে ছাড়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে মোড়কে এমনভাবে প্যাকেটজাত করা হয় যে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে আসল-নকল আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকৃত চিনিগুঁড়া চালে কৃত্রিম বা ঝাঁজালো সুগন্ধ থাকে না। এর দানার গঠন, রং ও আকৃতি স্বতন্ত্র। রান্নার পর চালটি থেকে স্বাভাবিক ও মৃদু সুবাস বের হয়। কিন্তু কৃত্রিম সুগন্ধিযুক্ত নকল চালে শুরু থেকে তীব্র গন্ধ থাকে, যা অনেক ক্রেতা উন্নত মানের চালের বৈশিষ্ট্য বলে ধরে নেন। ক্রেতাদের এই অজ্ঞতাকেই পুঁজি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তুলনামূলক কম দামে নিম্নমানের চাল কিনে কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে তারা বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কম দামে বিরিয়ানি বিক্রি করা অনেক রেস্তোরাঁয় এই নকল চিনিগুঁড়া চাল ব্যবহার করা হয়। সাভার বাজার রোডের ‘মা বিরিয়ানি’ হাউসের মালিক মো. রিজওয়ান কাজী বলেন, বর্তমানে আসল চিনিগুঁড়া চালের ২৫ কেজির একটি বস্তার দাম ৫ হাজার টাকা। মাত্র ১৫ দিন আগেও একই বস্তা সাড়ে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে কৃত্রিম সুগন্ধিযুক্ত নিম্নমানের চালের ২৫ কেজির বস্তা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যায়। দামের এই বড় ব্যবধানের কারণে অনেক বিরিয়ানির দোকানমালিকেরা কম দামের কৃত্রিম সুগন্ধিযুক্ত চাল ব্যবহার করছে। কারণ, আসল চিনিগুঁড়া চাল দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়, আর সেই অনুযায়ী দাম বাড়ালে অনেক ক্রেতাই তা দিতে আগ্রহী হয় না।

আসল ও নকল চিনিগুঁড়া চাল চেনার উপায় সম্পর্কে রিজওয়ান কাজী বলেন, দুই ধরনের চালের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো দামে। আসল চিনিগুঁড়া চালের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও এতে কাঁচা অবস্থায় তেমন কোনো গন্ধ থাকে না; বরং রান্নার পর স্বাভাবিকভাবে মনোরম সুগন্ধ ছড়ায়। অন্যদিকে, নকল চিনিগুঁড়া চালে কাঁচা অবস্থাতেই তীব্র গন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর মতে, এই গন্ধ সাধারণত বিশেষ ধরনের সুগন্ধি পাউডার বা রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হয়।

সাভারের নামাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী ও সাভার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন মোল্লা বলেন, নামাবাজারে বিভিন্ন আকর্ষণীয় মোড়কে কৃত্রিম সুগন্ধিযুক্ত চাল চিনিগুঁড়া চাল হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। কম দাম ও তীব্র সুগন্ধের কারণে অনেক ক্রেতা এগুলো কিনে প্রতারিত হচ্ছে। বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও একটি অনুষ্ঠানের জন্য ওই চাল কিনে প্রতারিত হয়েছি।’

নামাবাজারের গোকুল স্টোরের মালিক বিপ্লব সাহা বলেন, ‘এসব ব্র্যান্ডের চালের মান তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দামও কম। তবে এতে কৃত্রিম সুগন্ধি মেশানো হয় কি না, সে বিষয়ে জানা নেই। আমরা মিল থেকে চাল কিনে বিক্রি করি। যদি সুগন্ধি মেশানো হয়ে থাকে, তাহলে তা মিল থেকেই করা হয়ে থাকতে পারে।’

মেসার্স মুক্তা বাণিজ্যালয়ের মালিক রনি দেবনাথ বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী আমাদের গুদামে কম দামের চিনিগুঁড়া চাল সরবরাহ করেন। আমরা সেগুলো বিক্রি করি। এর বাইরে এ বিষয়ে আমাদের আর কিছু জানা নেই।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আমজাদুল হক বলেন, অনুমোদনহীন সুগন্ধি বা রাসায়নিক ব্যবহার করে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করা শুধু ভোক্তা প্রতারণাই নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন এ ধরনের চাল খেলে লিভার, কিডনি, পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, খাদ্যে কৃত্রিম ও অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত বাজার তদারকি, সংশ্লিষ্ট মিল ও ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও আসল ও নকল চিনিগুঁড়া চাল চেনার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত