Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই–এর নিবন্ধ /আমিরাতের ওপেক ত্যাগ: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন ‘চুক্তি’র ফল নাকি আরও বড় খেলা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ৪৯
আমিরাতের ওপেক ত্যাগ: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন ‘চুক্তি’র ফল নাকি আরও বড় খেলা
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার বিষয়টি ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র কোনো গোপন চুক্তির ফল। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনীতিতে আরেকটি ফাটল স্পষ্ট হলো। মে মাসের ১ তারিখ থেকে ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত যেন সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল সৌদি আরবের দিকে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একধরনের রাজনৈতিক ইঙ্গিত বলেও মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ যে উপসাগরীয় অঞ্চলে ঐক্য গড়ার বদলে পুরোনো দ্বন্দ্বগুলোকে আরও উসকে দিচ্ছে, সেটাই আবার সামনে চলে এল।

ওপর থেকে দেখলে, ওপেক বা অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধেরই পরিণতি। এই বিরোধ মূলত সদস্য দেশগুলো কতটা তেল উৎপাদন করবে, সেটিকে ঘিরেই। এত দিন রিয়াদ চেয়েছে সরবরাহ কমিয়ে দাম ধরে রাখতে, আর আমিরাত বরাবরই চেয়েছে উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে বেশি তেল ছাড়তে।

গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোম্যান রাসমুসেন বলেন, ‘আমিরাত সব সময়ই ভলিউম বা পরিমাণগত কৌশলের পক্ষে ছিল, আর সৌদিরা ছিল মূল্য কৌশলের পক্ষে, অর্থাৎ দাম ধরে রাখার পক্ষে।’ এই পার্থক্যের শিকড় দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয়। সৌদি আরবে জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ এবং তাদের প্রমাণিত তেল মজুত আমিরাতের দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে, আমিরাতের নাগরিক সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ। ফলে তেল থেকে আসা আয় তুলনামূলক কম মানুষের মধ্যে ভাগ হয়।

এ ছাড়া, আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যাতে তারা আরও বেশি তেল উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, তারা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। রাসমুসেন বলেন, ‘বর্তমান উৎপাদনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অব্যবহৃত সক্ষমতা রয়েছে এমন ওপেক দেশ হলো আমিরাত।’ তিনি যোগ করেন, ‘অর্থনৈতিক বিচারে এটি যুক্তিসংগত হতে পারে। কারণ, মাটির নিচে থাকা সম্পদের মূল্য পাঁচ বা দশ বছর পর একই না-ও থাকতে পারে।’

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ধীরে ধীরে আমিরাতের অবস্থানের কাছাকাছি চলে আসছিল। একসময় যারা তেল সরবরাহ কমাতে নিজেদের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তুললে ‘চরম মূল্য দিতে হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিত, সেই রিয়াদই শেষ পর্যন্ত বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সিনিয়র ফেলো গ্রেগ প্রিডি বলেন, ‘আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য বহুদিন ধরেই আছে। কিন্তু সৌদি আরব এখন বাজারের অংশ ফিরে পেতে চায়। যুদ্ধের কারণে তাদের আগের যুক্তি গুরুত্ব হারিয়েছে। এই প্রস্থান অনেক বেশি রাজনৈতিক।’

ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশের এই সিদ্ধান্ত এমন একসময়ে এল, যখন আবুধাবি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাপ দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের কাছেও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়লে ইসরায়েল আমিরাতে আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিবিদ পাঠিয়েছিল।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানের ওপর হামলা না চালানোর আহ্বান উপেক্ষা করায় অসন্তোষ থাকলেও, সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের পাশেই রয়েছে। সৌদি আরব একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে সহায়তা করেছে—ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ ও আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে। অন্যদিকে, তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকেও সমর্থন দিয়েছে।

অন্যদিকে, আমিরাত প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছে এবং পাকিস্তান যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি করতে না পারে, সেই প্রচেষ্টাও চালিয়েছে।

ওপেক ছাড়ার পেছনে কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির হিসাব

যুক্তরাষ্ট্র যখন ভাবছে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করবে, নাকি যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, ঠিক সেই সময় ওপেক ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে। কারণ, তিনি বহুদিন ধরেই ওপেককে অভিযুক্ত করে আসছেন যে এই জোট ‘বিশ্বের বাকি অংশকে ঠকাচ্ছে’।

থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো এবং ‘সৌদি ইনকরপোরেশনে’র লেখক এলেন ওয়াল্ড বলেন, ‘এই বিচ্ছেদ সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ধরনের “চুক্তি”র ফল হতে পারে। যেখানে তারা ইরানের বিরুদ্ধে আমিরাতকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে, বিনিময়ে ওপেককে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়ার শর্তে, যা ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই চেয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিগগিরই কোনো ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণার সম্ভাবনা থাকলে আমি অবাক হব না।’

এদিকে, এমন কিছু ইঙ্গিত মিলছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করছে। মিডল ইস্ট আই জানিয়েছিল, আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বলেছেন, আবুধাবি এই যুদ্ধ ৯ মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে ধরে নিচ্ছে।

এ মাসের শুরুতে, আমিরাত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কারেন্সি সোয়াপ লাইনের অনুরোধও জানায়, যাতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেলে ডলারের প্রবাহ নিশ্চিত থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটি সৌদি আরবের সঙ্গে আমিরাতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ। ওপেক, রাশিয়াসহ বিস্তৃত জোট ওপেক প্লাস—দুটোর ওপরই সৌদির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘এতে সৌদিরা ক্ষুব্ধ হবে। মনে হচ্ছে আমিরাতের মাথায় আরও বড় কিছু পরিকল্পনা আছে।’

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি আরব এবং আমিরাতের মতো তারও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বাস্তবে, ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছিল সৌদি আরব। পাশাপাশি, সুদানের গৃহযুদ্ধেও দুই দেশ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। ইরানের হামলার পর কিছু বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, এই যুদ্ধ হয়তো দুই দেশের সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ করবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেখা যাচ্ছে, আবুধাবি ও রিয়াদ তাদের প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে, সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তান থেকে পাঠানো অস্ত্র মার্চ মাসে পূর্ব লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে। রিয়াদ চেষ্টা করছে তার বাহিনীকে আমিরাতের প্রভাব থেকে দূরে সরিয়ে নিতে।

আমিরাত আরও শক্তিশালী

আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল আল-মাজরুই এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত, যা দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল, যুদ্ধের কারণে সহজ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে সময়টা ঠিক। কারণ, এতে অন্যান্য উৎপাদকদের ওপর প্রভাব খুবই কম।’

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক বার্নার্ড হাইকেল বলেন, ‘জ্বালানি উৎপাদন নিয়ে আমিরাতের দৃষ্টিভঙ্গি সৌদি আরবের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। এর মানে এখন তাদের আর সৌদিদের কথা শুনতে হবে না, যারা ওপেকে শর্ত নির্ধারণ করে।’ তিনি যোগ করেন, ‘তারা বহু বছর ধরেই ওপেক ছাড়ার কথা ভাবছিল। সম্ভবত যুদ্ধের কারণেই তারা শেষ পর্যন্ত তা করেছে। এখন সবকিছু অনিশ্চিত, আর এই সময় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বাস্তব দিক থেকে দেখলে, আমিরাতের হাতে প্রচুর অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তারা চাইলে সৌদিদের মতো বাজার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকাও নিতে পারে। এতে তারা অনেক বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে।’

জ্বালানি বিশ্লেষকেরাও একমত, সময় নির্বাচনটি যথাযথ হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা আমিরাত এখন পাইপলাইনের মাধ্যমে ফুজাইরাহ বন্দরে প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেল পাঠাচ্ছে। এই পথ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আরব সাগর হয়ে তেল বের করতে পারে।

তাত্ত্বিকভাবে, আমিরাতের হাতে অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। সেন্টার ফর ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রিডি বলেন, ‘যদি যুদ্ধের আগে আমিরাত ওপেক ছাড়ত, সেটি বড় ঘটনা হতো। কিন্তু এখন যুদ্ধের কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে আসবে না। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও, বৈশ্বিক মজুতের ঘাটতি এত বেশি থাকবে যে তাদের বাড়তি রপ্তানি সহজেই শোষিত হবে।’

তবে দীর্ঘ মেয়াদে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত ৬৫ বছর পুরোনো জ্বালানি জোটের জন্য একধরনের মৃত্যুঘণ্টা হতে পারে—যা গড়ে উঠেছিল ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলার উদ্যোগে। রাসমুসেন বলেন, ‘এটি ওপেকের জন্য বড় ধাক্কা। আমরা হয়তো এর মৃত্যুঘণ্টা লিখছি।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত