
সুদূরপ্রসারী সামরিক ফলাফলের বাইরেও কিছু যুদ্ধের এমন ক্ষমতা থাকে, যা পুরো অঞ্চলকে নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ আরব আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা বলয়ের চারপাশে পুনর্গঠিত করেছিল। আর ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ এমন এক সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঢেউ তৈরি করেছিল, যা প্রায় দুই দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে।
সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধও একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, উপসাগরীয় অংশীদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একইসঙ্গে এটি অঞ্চলের কয়েকটি শক্তিকে আরও অস্থিতিশীল পরিবেশে নতুন ধরনের সমন্বয় ও সহযোগিতার পথ খুঁজতে উৎসাহিত করেছে।
সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আঞ্চলিক সংকটগুলোতে তাদের অবস্থান ক্রমেই বেশি সমন্বিত হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইথিওপিয়ার মধ্যে সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলে বহু দশক ধরে কার্যকর থাকা নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চজুড়ে সামরিক ঘাঁটি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং নিজেকে উপসাগরীয় নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সবসময় স্বাগতিক দেশগুলোকে আঞ্চলিক সংঘাতের পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে না। বরং তা অনেক সময় তাদের ওপর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ব্যয় চাপিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে, কাতারে ইরানের হামলা দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাময়িকভাবে অচল করে দিয়েছিল।
এর মানে এই নয় যে, উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্তত নিকট ভবিষ্যতে এমন বিকল্প বাস্তবসম্মত নয়। তবে উপসাগরীয় সরকারগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পথ খুঁজছে।
এই প্রেক্ষাপটে রিয়াদ, আঙ্কারা, কায়রো ও ইসলামাবাদের সমন্বয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি। সৌদি আরব সরবরাহ করছে আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্ক উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি, মিসর সামরিক ও ভৌগোলিক ওজন, আর পাকিস্তান দিচ্ছে রাজনৈতিক, সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা। একত্রে এসব সম্পদ আরও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করছে। তবে এই উদীয়মান সমন্বয়কে এখনই একটি সুসংহত জোট হিসেবে বর্ণনা করা হবে সময়ের আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ, এসব দেশের সম্পর্কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অবিশ্বাসের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আর তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারও সবসময় এক নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০১৭ সালে কাতার অবরোধকে ঘিরে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে। একইভাবে ২০১৩ সালে সাবেক মিসরীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সামরিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিসর ও তুরস্কের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল লিবিয়া সংকট।
অন্যদিকে, ইসরায়েল এমন একটি নতুন অংশীদারত্বের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে বলে মনে হচ্ছে, যার অনুপ্রেরণা এসেছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের তথাকথিত ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ থেকে। তখন আরব বিশ্বকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে প্রান্তিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল ইসরায়েল। এই নীতির সমসাময়িক সংস্করণ অনেক বেশি বিস্তৃত এবং কৌশলগতভাবে পরিণত। এটি হর্ন অব আফ্রিকা বা আফ্রিকার শিং অঞ্চল থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই কৌশলে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর আবুধাবি ও তেল আবিবের সম্পর্ক সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।
ভারতও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উঠে এসেছে আইটু-ইউটু (I2U2) জোটের মাধ্যমে। এই কাঠামো ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব তৈরি করেছে। একই সময়ে পরিকল্পিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প ইসরায়েলের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য নিজেদের বন্দরগুলোকে এশিয়া ও ইউরোপকে সংযুক্ত করা একটি পরিবহন কেন্দ্রে রূপ দেওয়া।
ইতিমধ্যেই ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের বড় ক্রেতা। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের অংশ ছিল ইসরায়েলের মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৩৪ শতাংশ। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ভারত ছিল সবচেয়ে বড় একক আমদানিকারক।
গ্রিস ও সাইপ্রাস এই নেটওয়ার্কের পশ্চিম দিকের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ২০১০ সালে গাজাগামী সহায়তা বহরে অংশ নেওয়া মাভি মারমারা জাহাজে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী অভিযানের পর তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। এরপর ইসরায়েল জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতে এই দুই দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করতে থাকে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পর্ক পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষার একটি উপায় হয়ে ওঠে এবং অঞ্চলটিকে সংযুক্ত করে এমন অর্থনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের দিকে বিস্তৃত।
আরও দক্ষিণে, ইথিওপিয়া ও সোমালিল্যান্ডও এই পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভূমিকা রাখছে। ইথিওপিয়া সমুদ্রে প্রবেশাধিকার পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, আর সোমালিল্যান্ড তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রকল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে। গাজা যুদ্ধ চলাকালে হুতিদের হামলার পর ইসরায়েল এই অঞ্চলের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিয়েছে, যাতে নৌপথ সুরক্ষিত রাখা যায় এবং দক্ষিণ লোহিত সাগর থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলা করা যায়।
ফলে লোহিত সাগর ও আফ্রিকার শিং অঞ্চলে ইথিওপিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের স্বার্থের একটি অভিসার তৈরি হয়েছে। তাদের লক্ষ্য এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে তোলা। আর এই পরিবর্তনকে কায়রো, রিয়াদ ও আঙ্কারা নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
তবে এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও অঞ্চলটি দুটি কঠোর ও মুখোমুখি জোটের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করা বিভ্রান্তিকর হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখায়, স্থিতিশীল জোট গড়ে তোলা সবসময়ই কঠিন কাজ। এই অঞ্চল পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা, আর নীতিনির্ধারণ প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের বদলে সংকট মোকাবিলা ও স্বল্পমেয়াদি হিসাব-নিকাশ দ্বারা পরিচালিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে, মিসর সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ালেও আমিরাতের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহায়তার গুরুত্ব উপেক্ষা করতে পারে না। একই সঙ্গে তারা এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিকে একটি কৌশলগত পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে তুরস্কও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছে এবং সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করার তেমন কোনো আগ্রহ তাদের নেই।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যা গড়ে উঠছে, তা কঠোর জোটব্যবস্থার চেয়ে বরং নমনীয় ও একে অপরের সঙ্গে আংশিকভাবে মিলে থাকা অংশীদারত্বের নেটওয়ার্ক। রাষ্ট্রগুলো এক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে, আবার অন্য ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। তারা নিরাপত্তা ইস্যুতে একমত হতে পারে, অথচ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অঙ্গনে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়তো প্রচলিত অর্থে নতুন জোট তৈরি করবে না। কিন্তু এটি ইতোমধ্যে চলমান আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোকে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো খুঁজতে বাধ্য করছে। এমন এক সময়ে, যখন পুরোনো নিশ্চিয়তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে এবং নিরাপত্তা, সম্পদ, সামুদ্রিক রুট, জ্বালানি ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য নেতারা যেখানে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আক্রমণ ও উসকানির জবাবে নজিরবিহীনভাবে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর শুরু করছেন আজ রোববার থেকে। এই সফরে তিনি মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন। এই খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, ভারতকে এড়িয়ে তারেক রহমানের চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের একটি ইঙ্গিত।
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা হোসেইনি খামেনির অনড় অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার বিরোধী কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এতে আরও শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
২০১৮ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরান পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, তখন তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামা একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ওবামা বলেছিলেন, ‘ইরানের পক্ষ থেকে চুক্তি লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণ ছাড়াই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে...
১ দিন আগে