Ajker Patrika

শীর্ষ নিরাপত্তা পদে কেন মোহসেন রেজাইকে বেছে নিল ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
শীর্ষ নিরাপত্তা পদে কেন মোহসেন রেজাইকে বেছে নিল ইরান
মোহসেন রেজাই। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) নতুন সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই। যুদ্ধাবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে তাঁর এই নিয়োগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৭১ বছর বয়সী রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে তাঁর নেতৃত্বের সময়েই ইরান-ইরাক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইরানে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ নামে পরিচিত। পরে তিনি ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হন। সংস্থাটি পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে আইন নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মোহসেন রেজাই বিশেষভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে ইরানের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখেন। জুলাইয়ে তিনি বলেছিলেন, এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ‘ডজন ডজন পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি মূল্যবান’। সম্প্রতি তিনি এক সতর্কবার্তায় বলেন—ইরানের বন্দর অবরোধ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গুরুতর ঝুঁকি ও হতাহতের’ মুখোমুখি হতে হবে।

রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয় রেজাইকে এসএনএসসির সচিব হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেয়। একই দিনে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁকে কাউন্সিলে নিজের প্রতিনিধি হিসেবেও নিয়োগ দেন। এর আগে এই পদে ছিলেন মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর। তাঁর পূর্বসূরি আলি লারিজানি গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।

এসএনএসসি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত সমন্বিত হয়। ফলে এর সচিবের পরিচয় শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; বিশেষ করে যুদ্ধ ও কূটনৈতিক সংকটের সময়ে তা ইরানের নীতির দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত দেয়।

তেহরানভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য কৌশলবিষয়ক গবেষক আব্বাস আসলানি মনে করেন—রেজাইয়ের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

রেজাই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফকে সমর্থন করেছিলেন। ফলে তিনি রক্ষণশীল শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও সাঈদ জলিলির নেতৃত্বাধীন আরও কট্টরপন্থী অংশের সঙ্গেও তাঁর অবস্থান পুরোপুরি অভিন্ন নয়। এই কারণে পেজেশকিয়ানের তুলনামূলকভাবে আলোচনামুখী সরকার, কালিবাফের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবির এবং সামরিক নেতৃত্ব—এই তিন পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির সুযোগ তাঁর রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে রেজাইয়ের নিয়োগকে ভিন্নভাবেও দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মোহসেন ফারখানি মনে করেন, এটি ইরানের নিরাপত্তা নীতিতে সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব বাড়ার ইঙ্গিত। তাঁর মতে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তেহরান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও ‘শাস্তিনির্ভর প্রতিরোধ’ কৌশলের দিকে আরও এগোতে পারে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাবেক আইআরজিসি প্রধানকে আলোচনার কেন্দ্রস্থলে আনা হলে ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা হলেও তা ইরানের কট্টরপন্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সহজ হতে পারে। কারণ রেজাইয়ের মতো সামরিক ব্যক্তিত্বকে দুর্বলতা বা জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা তুলনামূলক কঠিন।

ফলে রেজাইয়ের নিয়োগ একই সঙ্গে দুই ধরনের বার্তা দিচ্ছে—ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত, আবার প্রয়োজন হলে সেই কঠোর অবস্থান থেকেই কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর রাজনৈতিক ভিত্তিও তৈরি করতে চাইছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত