Ajker Patrika

নির্জনা হত্যাকাণ্ড

সম্পাদকীয়
নির্জনা হত্যাকাণ্ড

পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে মা-বাবা-সন্তানের সম্পর্ক। একসময় মা-বাবার অকারণ অপত্যস্নেহ দেখে সমালোচনা করত মানুষ। এখন মা-বাবা অবলীলায় সন্তানকে হত্যা করতে পারেন, লাশ লুকিয়েফেলে দিতে পারেন কোথাও এবং দোষ চাপাতে পারেন মেয়ের স্বামীর ওপর। ৮ জুলাই রাতে খুলনা শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় নির্জনা নামের একটি মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে কত কিছুই তো দেখতে হচ্ছে।

এ কথা সত্য, নিশ্চয়ই মেরে ফেলার জন্য কাঠের চলা দিয়ে মেয়ের মাথায় আঘাত করা হয়নি। কিন্তু বিবাহিত মেয়েকে স্বামীর বাড়ি যেতে না দেওয়ার জন্য মা-বাবা যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাতে বোঝা যায় যে অভিভাবকদের সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বিবাহিত মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ কোনো সভ্য সমাজের নয়।

ঘটনাটি অস্বাভাবিক বলে তা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমরা বহুবার সম্পাদকীয় নিবন্ধে পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছি। সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে, এ কথা নতুন করে বলার নয়। কিন্তু এ জন্য সব দোষ প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে বসে থাকার কোনো উপায় নেই। মানুষে-মানুষে মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করা, শ্রদ্ধা-স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করা, ঘৃণা-ঈর্ষামুক্ত হয়ে একে অন্যকে দেখার যে শিক্ষা একসময় পরিবার থেকে পাওয়া যেত; সেই শিক্ষা ধীরে ধীরে সমাজ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

সেখানে গড়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিকতা। আদিকাল থেকে পূর্ব প্রজন্ম আর উত্তর প্রজন্মের মধ্যে ভাবনার ফারাক বিদ্যমান। পূর্ব প্রজন্ম তাদের অধীত বিদ্যা ও অভিজ্ঞতায় স্থিত হয়ে নতুন কিছু গ্রহণ করতে চায় না। নতুন প্রজন্মও পুরোনোদের ভাবনাকে ছুড়ে ফেলতে চায়। একসময় দুই প্রজন্মের দুই সত্যের মধ্যে কোথাও সন্ধি হয়। তাতে সমাজ গতি পায়। ইদানীং মানুষে-মানুষে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও জটিল হচ্ছে। এখন বয়স বা অভিজ্ঞতার ব্যবধানের মধ্য দিয়ে অন্তঃশীলা একটি বিভাজন প্রকট হয়ে

উঠছে। সামাজিক জীবনযাপনের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যাচ্ছে মানুষ। ফলে কারও প্রতি কারও সম্মানবোধ জাগ্রত হচ্ছে না। পৃথিবীজুড়ে এই প্রবণতা বাড়ছে। খুলনার ঘটনাটি সরাসরি হয়তো এই বাস্তবতা থেকে উত্থিত হয়নি, তবে কোনো না কোনোভাবে জীবনযাপনে এই প্রবণতা মিশে আছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

বাবার আঘাতে মেয়ের মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুকে ধামাচাপা দিতে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় মেয়ের লাশ নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো অস্বাভাবিক ঘটনার কি কোনো ব্যাখ্যা আছে? আমাদের সমাজ থেকে পরমতসহিষ্ণুতা প্রায় উধাও হয়ে গেছে। ঘৃণা, চাঁদাবাজি ও মব করে মাস্তানি দিন দিন এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যা দেশের রাজনৈতিক স্বাস্থ্যকে ক্রমেই হীনবল করে তুলছে। একই সঙ্গে দেশের সামাজিক স্বাস্থ্যও যে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে, তার একটি জলজ্যান্ত প্রমাণ নির্জনা হত্যা।

বিচারের মাধ্যমে শাস্তি হোক। সেই সঙ্গে সমাজের এই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো প্রতিরোধের উপায়ও খুঁজে বের করা হোক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত