
জাতীয় সংসদের সদস্যরা যাতে নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, খেয়াঘাট ইত্যাদির নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিজেরাই করতে পারেন, সে জন্য তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এ অর্থ কোথায় কোন কাজে ব্যবহার করা হবে, সংশ্লিষ্ট এমপি সেটির তালিকা তৈরি করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি) দিলে এলজিইডি সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ কাজগুলো আদৌ এমপিদের এখতিয়ারাধীন বিষয় কি না? সংবিধানের ৫৯(২) (গ) অনুচ্ছেদে স্পষ্টত বলা আছে, স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, ‘জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’।
কিন্তু যে কাজগুলো করার জন্য এমপিদের ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, সংবিধানের ওই বর্ণনা অনুযায়ী, সে কাজগুলো তাঁদের দায়িত্ব-পরিধির মধ্যে পড়ে না। তা সত্ত্বেও তাঁরা যদি তা করেন বা তা করার জন্য সরকার যদি তাঁদের বরাদ্দ ও অনুমোদন দেয়, তাহলে সেটি হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের বরাদ্দ ও অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রের সংবিধান সরকারকে দেয়নি। অন্যদিকে সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে’। অর্থাৎ এমপিদের কাজ হচ্ছে শুধু আইন প্রণয়ন করা। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বস্তুত ৫৯(২) (গ) অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা পুনর্নিশ্চিত করা হলো।
আর এসব কাজ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সম্পাদনের বিষয়ে সংবিধান এতটাই তাগিদ বোধ করেছে যে এটি বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণের জন্য ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘৫৯ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীকে পূর্ণ কার্যকারতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ আইনের দ্বারা উক্ত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্থানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করিবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল সংরক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করিবেন।’ এমনি পরিস্থিতিতে সংবিধানের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা থাকলে এবং সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ ও আন্তরিক হলে এমপিদের ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা থেকে অবিলম্বে সরে এসে এসব কাজ স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা উচিত হবে বলে মনে করি। এ প্রসঙ্গে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও জাতীয় সংসদের সদস্যদের বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করি, রাষ্ট্রের সংবিধান ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে হলেও এ কাজগুলো এমপিদের মাধ্যমে কেন করতে হবে? এ কাজগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সম্পন্ন হলে এমপিদের অসুবিধা কোথায়? দেশের উন্নয়নই যদি শেষ পর্যন্ত সরকারের লক্ষ্য হয়, তাহলে তা কার মাধ্যমে হলো সেটি তো জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে, কাজটি মানসম্মতভাবে হলো কি না, সেটি। আর যার কাজ, সেটি তার মাধ্যমে হওয়াটাই তো একটি দক্ষ ও আদর্শ সরকারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের কর্ম বিভাগের আওতায় দেশে একটি পরিকল্পনা কমিশন রয়েছে, যার কাজ হচ্ছে দেশের জন্য জাতীয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমোদন ও সেসবের বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থানীয় পর্যায়ে যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, পরিকল্পনা কমিশন জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সেসবেরও সমন্বয় ও সংযোগসাধন করবে। ফলে দেখাই যাচ্ছে যে রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে পরিকল্পনা কমিশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের বাইরে বা এর মধ্যবর্তী পর্যায়ে এমপি বা অন্য কারোরই কোনোরূপ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেটি করা হলে একদিকে তা যেমন সংবিধানের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে, অন্যদিকে সেটি হবে পরিকল্পনা-শৃঙ্খলারও চরম পরিপন্থী কাজ। কোনো নির্বাচিত ও দায়িত্বশীল সরকারেরই সেটি করা সমীচীন হবে না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে দেশের নির্বাচিত সরকারগুলো গত প্রায় তিন দশক ধারাবাহিকভাবে সংবিধান পরিপন্থী এ কাজ করে যাচ্ছে, যার শুরুটা অষ্টম জাতীয় সংসদের আওতায় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে। এমপিদের প্রদত্ত উন্নয়ন বরাদ্দের ব্যবহার বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষার ফল থেকে জানা যায়, এসব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিসরে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থের অপব্যবহার ইত্যাদি হয়ে থাকে এবং এসবের সঙ্গে এমপিদের আত্মীয়স্বজন, দলীয় কর্মী ও অন্যান্য স্বার্থ-সম্পর্কিত লোকজন যেমনি জড়িত থাকে, তেমনি বড় পরিসরে যুক্ত থাকে এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। তাই টিআইবির খুবই যথার্থ আশঙ্কা যে এ-জাতীয় প্রকল্পে এমপিরা যুক্ত থাকলে একই ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অর্থের অপব্যবহার ইত্যাদি ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবারও ঘটতে পারে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ খুবই যথার্থ। তবে এ ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি দুর্নীতি, অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির নয়; বিষয়টি এখতিয়ার থাকা বা না থাকার এবং পরিকল্পনা-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার। এমপিদের এ কাজ করার এখতিয়ার যেমন সংবিধান দেয়নি, তেমনি রাষ্ট্রের কর্মকাঠামো অনুযায়ীও এটি তাঁরা করতে পারেন না।
আর সে বিবেচনা থেকে সরকারের উচিত হবে প্রত্যেক এমপিকে বরাদ্দ দেওয়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে আসা। সংসদে দাঁড়িয়ে এমপিরা অনর্গল যেসব স্থানীয় দাবিদাওয়া নিয়ে সংসদ অধিবেশন সরব করে রাখছেন, সেসব থেকেও তাঁদের বিরত থাকতে হবে। কারণ, সংসদ এসব দাবিদাওয়া উত্থাপনের উপযুক্ত স্থান নয় এবং এসব দাবিদাওয়া উত্থাপন তাঁদের কাজও নয়। কিন্তু যেগুলো তাঁদের কাজ, সেসব বিষয়ে তাঁরা কিন্তু একেবারেই নির্লিপ্ত। মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধিকাংশই এখন পর্যন্ত গঠিত হয়নি। অথচ এ কমিটিগুলোই হচ্ছে সংসদের প্রাণ ও মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু সেসব নিয়ে তাঁদের কোনো আগ্রহ নেই। এমনকি বিরোধী দলও এ ব্যাপারে অনেকটা নীরব। দেশে বিদ্যমান বহুসংখ্যক আইনের অনেকগুলোই নানা কারণে সংশোধন ও হালনাগদ করা প্রয়োজন। কিন্তু সংসদ সদস্যরা কি জানেন, এ তালিকায় কোন কোন আইন আসা দরকার? এমন অনেক আইন আছে, যেগুলো বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক বিধি প্রণীত না হওয়ার কারণে বহুক্ষেত্রে এসব আইনের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারেও এমপিদের এগিয়ে আসা উচিত।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশের সঙ্গে যেসব অসম চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছে, সেসব বাতিল বা সংশোধনের বিষয়েও সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এর সদস্যরা এ ব্যাপারে এতটাই নিস্পৃহ যে মনে হয়, যেন এ চুক্তির দায় শুধু এ দেশের জনগণের; সংসদ সদস্যদের এ ব্যাপারে কিছুই করণীয় নেই! সম্মানিত এমপিরা, আপনারা কি দয়া করে এ বিষয়গুলোর দিকে তাকাবেন?
বস্তুত জাতীয় সংসদের হাতে এখন এত কাজ জমে আছে যে নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, বাজার, খেয়াঘাট ইত্যাদির দিকে তাকাবার ফুরসতই এমপিদের থাকার কথা নয়। কিন্তু তাঁদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তাঁদের হাতে যেহেতু আর কোনো কাজ নেই, তাই সময় ও সামর্থ্যকে কাজে লাগানোর জন্য তাঁরা অগত্যা স্থানীয় সরকারের কাজকেই আপন করে নিয়েছেন। আর তাই অনুচিত আপনত্বের বোধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সর্বাগ্রে যে কাজ করার জন্য প্রস্তাব করব তা হচ্ছে, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান কার্যকরের জন্য বেশ কিছু নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে, সে আইনগুলো অন্তত আপনারা ৩৫০ জন মিলে করে গেলে জাতি আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।
এ ক্ষেত্রে আলোচনার সূত্রপাত হিসেবে বলি, স্থানীয় সরকারের হাতে কর আদায়, বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গঠন ইত্যাদি সংক্রান্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গেলে এ বিষয়ে বেশ কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। বর্তমান জাতীয় সংসদ আইনগুলো করে দিলে এ দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে। আর এ ধরনের আইন প্রণয়নই বস্তুত সংসদের কাজ। তাই নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, বাজার, গুদারাঘাট ইত্যাদি স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে করতে দিন। তবে এ কাজগুলো তাঁরা যাতে মান ও দক্ষতা বজায় রেখে করতে পারেন, সে জন্য নতুন আইন ও বিধি প্রণয়ন করে তাঁদের সাহায্য করুন। আর কার্যত এখানেই রয়েছে একটি সংসদের যোগ্যতার প্রকৃত মাপকাঠি।
আবু তাহের খান ,সাবেক পরিচালক, বিসিক

পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে মা-বাবা-সন্তানের সম্পর্ক। একসময় মা-বাবার অকারণ অপত্যস্নেহ দেখে সমালোচনা করত মানুষ। এখন মা-বাবা অবলীলায় সন্তানকে হত্যা করতে পারেন, লাশ লুকিয়েফেলে দিতে পারেন কোথাও এবং দোষ চাপাতে পারেন মেয়ের স্বামীর ওপর। ৮ জুলাই রাতে খুলনা শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় নির্জনা নামের...
১৩ মিনিট আগে
ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার অনেক আগেই পৃথিবীর অসংখ্য শহর যেন দুই রঙে ভাগ হয়ে যায়। একই মহল্লার একই ভবনের ছাদে উড়তে থাকে দুই দেশের পতাকা। একই পরিবারের রাতের খাবারের টেবিলেও শুরু হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তর্ক। বাংলাদেশের অলিগলি থেকে শুরু করে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া.....
১ ঘণ্টা আগে
জাতীয় সংসদের সদস্যরা যাতে নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, খেয়াঘাট ইত্যাদির নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিজেরাই করতে পারেন, সে জন্য তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এটি কয়েকটি বিষয়ের সম্মিলিত প্রভাব। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং, গবেষণা সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনিক সহায়তা—এসব ক্ষেত্রে আরও উন্নতি প্রয়োজন।
১ দিন আগে