Ajker Patrika

সমর্থক ও খেলার সৌন্দর্য

মোশফেকুর রহমান
সমর্থক ও খেলার সৌন্দর্য

ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার অনেক আগেই পৃথিবীর অসংখ্য শহর যেন দুই রঙে ভাগ হয়ে যায়। একই মহল্লার একই ভবনের ছাদে উড়তে থাকে দুই দেশের পতাকা। একই পরিবারের রাতের খাবারের টেবিলেও শুরু হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তর্ক। বাংলাদেশের অলিগলি থেকে শুরু করে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া কিংবা চীনের বহু এলাকায় এই দৃশ্য যেন বিশ্বকাপেরই আরেকটি পরিচিত ছবি। মজার বিষয়, এসব দেশের জাতীয় দল কখনোই বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল পর্বে খেলেনি। তবু ঘর, পোশাক, অফিস কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই প্রিয় দলের রঙের ছাপ। ফুটবল সেখানে শুধু একটি খেলা নয়; এটি পরিচয়, স্মৃতি, আবেগ, এমনকি নিজের একটি অংশ।

সমর্থকের এই আবেগ অকৃত্রিম। একটি দলকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসার মধ্যেই গ্যালারির প্রাণ। কিন্তু এই আবেগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বৈপরীত্য। আমরা নিজের দলের পক্ষে আপসহীন থাকতে পারি, প্রতিপক্ষের সমর্থকের সঙ্গে উত্তপ্ত তর্কে জড়াতে পারি, এমনকি নিজের দলের ভুলও সহজে ক্ষমা করে দিই। অথচ রেফারির সামান্য পক্ষপাত কিংবা ধারাভাষ্যকারের একটি মাত্র একচোখা মন্তব্যও আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে।

এর উত্তর খুঁজতে হলে সমর্থক, রেফারি ও ধারাভাষ্যকারের ভূমিকাকে আলাদা করে দেখতে হবে।

সমর্থকের দায়িত্ব একটি দলের পক্ষে দাঁড়ানো; রেফারি ও ধারাভাষ্যকারের দায়িত্ব দুই দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা। এই দুই ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেললেই খেলার সৌন্দর্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমর্থক যদি আবেগহীন হয়ে যান, তাহলে গ্যালারি প্রাণ হারাবে। আবার রেফারি যদি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, তাহলে ম্যাচটি ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমি ভালো ফুটবল দেখতে চাই।’ কিন্তু ম্যাচ শুরু হওয়ার পর সেই দাবির প্রকৃত পরীক্ষা হয়। প্রতিপক্ষের একজন তরুণ ফুটবলার দুর্দান্ত ড্রিবলিং করে চোখধাঁধানো একটি গোল করলে নিরপেক্ষ দর্শক সেটিকে ফুটবল-শিল্পের সৌন্দর্য হিসেবে উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু সেই একই গোল যদি আমাদের প্রিয় দলের জালে হয়, তখন বিস্ময়ের জায়গা দখল করে নেয় হতাশা। তখন বুঝতে পারি, আমরা অনেক সময় সুন্দর ফুটবলের চেয়ে নিজের দলের জয়কেই বেশি ভালোবাসি। এটিই সমর্থকের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব।

এই মানবিক প্রবণতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নোবেলজয়ী মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেমান। মানুষের বিচার-বিশ্লেষণে নানা ধরনের মানসিক পক্ষপাত কাজ করে। আমরা সাধারণত এমন তথ্য ও ঘটনাকেই সহজে গ্রহণ করি, যা আমাদের পূর্বধারণাকে সমর্থন করে। ফুটবলের মাঠেও তার ব্যতিক্রম হয় না। একই ট্যাকল এক দলের সমর্থকের কাছে নিখুঁত রক্ষণ, অন্য দলের সমর্থকের কাছে স্পষ্ট ফাউল।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেলের প্রস্তাবিত ‘সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব’ এই অনুভূতিকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। মানুষ খুব সহজেই কোনো একটি দলের সঙ্গে নিজের পরিচয়কে একীভূত করে ফেলে। তখন প্রিয় দলের জয় শুধু স্কোরবোর্ডের জয় থাকে না; সেটি ব্যক্তিগত আনন্দে রূপ নেয়। পরাজয়ও শুধু দলের নয়, নিজের পরাজয় বলেই অনুভূত হয়। তাই প্রতিপক্ষের অসাধারণ ফুটবলও অনেক সময় সৌন্দর্যের বদলে হুমকি হয়ে ওঠে।

ইতিহাসও দেখিয়েছে, রেফারির প্রতি মানুষের নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা কত গভীর। ১৯৬৪ সালে টোকিও অলিম্পিকের বাছাইপর্বে পেরু ও আর্জেন্টিনার ম্যাচে পেরুর সমতাসূচক একটি গোল বাতিল করেন উরুগুয়ের রেফারি অ্যাঞ্জেল এদুয়ার্দো পাসোস। শেষ মুহূর্তের সেই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ দর্শকেরা মাঠে নেমে পড়েন। পরে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও পদদলনে ৩২৮ জন নিহত হন। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক স্টেডিয়াম বিপর্যয়গুলোর একটি এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, রেফারির বাঁশি শুধু খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে না; নিয়ন্ত্রণ করে কোটি মানুষের বিশ্বাসও।

এ কারণেই আধুনিক ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তি, অতিরিক্ত সহকারী রেফারি, ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণের ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু প্রতিভা নয়; বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাও।

তবে এই আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত শুধু ফুটবলের জন্য নয়; মানুষের বিচারবোধেরও। আমরা প্রত্যেকেই প্রতিদিন মানুষ, মতামত এবং ঘটনাকে বিচার করি। খুব কম সময়ই খেয়াল করি, সেই বিচার-বিবেচনার ভেতর আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, বিশ্বাস, অভ্যাস কিংবা আবেগ কতটা নীরবে প্রভাব ফেলছে। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই যেন এক অদৃশ্য রেফারি বাস করে। তার হাতে কোনো দৃশ্যমান বাঁশি নেই, কিন্তু তার সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয় আমরা কাকে বিশ্বাস করব, কাকে সন্দেহ করব, কাকে ক্ষমা করব কিংবা কাকে সমর্থন করব।

ফুটবলের মাঠে নিরপেক্ষ রেফারি যেমন খেলার মর্যাদা রক্ষা করেন, তেমনি জীবনের মাঠে আমাদের ভেতরের সেই অদৃশ্য রেফারিই রক্ষা করে প্রত্যেকের বিবেকের মর্যাদা। পৃথিবীর সব বাঁশির আওয়াজ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু নিজের ভেতরের বাঁশিটি কোন মুহূর্তে, কার পক্ষে এবং কী কারণে বেজে উঠবে—সেই সিদ্ধান্তটুকু এখনো আমাদের হাতেই।

মোশফেকুর রহমান, সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত