Ajker Patrika

হাওরাঞ্চল: সরকারের শর্তে বিপাকে কৃষক

  • খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত দেওয়া হয়েছে
  • শুকাতে না পারায় কৃষকদের ধানে আর্দ্রতা পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ২২ শতাংশ
  • গুদাম থেকে ধান ফেরত আসায় বাড়তি পরিবহন খরচে আরও দেনায় পড়ছেন কৃষক
  • খোলাবাজারেও ধস, কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা
সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ
হাওরাঞ্চল: সরকারের শর্তে বিপাকে কৃষক
জলাবদ্ধ মাঠে ধান কাটছেন দুই কৃষকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাওরে পানিতে তলিয়ে যাওয়া বোরোখেত থেকে যে ধান সংগ্রহ করেছেন, তা ঠিকমতো শুকাতে না পারায় দাম পাচ্ছেন না প্রান্তিক চাষিরা। এমনকি সরকারি গুদামের আর্দ্রতার শর্ত আর খোলাবাজারে ধসের মুখে পড়ে পানির দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।

কিশোরগঞ্জের কৃষকেরা জানান, ভেজা ধান নিয়ে তাঁরা সরকারি খাদ্যগুদামে গেলেও তা দিতে পারেননি। গুদামে ধান সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় কৃষকদের ধানে আর্দ্রতা পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ২২ শতাংশ। ফলে গুদাম থেকে ধান ফেরত আসায় পরিবহন খরচ জোগাতে গিয়ে আরও দেনায় পড়ছেন কৃষক।

ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি এলাকার কৃষক শওকত আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘খেতে পানি জইম্যা রইছে। অনেক কষ্টে ধান কাইটা আনছি। কিন্তু রোইদ নাই, ধান শুকামু কই? গুদামে নিলে কয় ধান ভেজা। অহন বাজারে ৫০০-৬০০ টেহা মণ বেচতাছি। ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খরচ দিয়ে মোট উৎপাদন খরচ হইছে ১,৩৫৪ টেহা।’

মাঠপর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রতি একরে গড় ফলন হয়েছে ৭০ মণ। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেই ধান ঘরে তোলা এখন কৃষকের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটতে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় একরপ্রতি কাটার মজুরি ৫০০-৬০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়।

​মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খাতে যেখানে আগে ৮-১০ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার কারণে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-২৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে একরপ্রতি খরচ বেড়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।

​কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি মণে চাষাবাদ (বীজ, সার, সেচ ও জমি চাষ) বাবদ উৎপাদন খরচ ১ হাজার টাকা। এর সঙ্গে জলাবদ্ধতার কারণে ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খাতে বাড়তি ৩৫৪ টাকা যোগ হয়ে প্রতি মণে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩৫৪ টাকা। বিপরীতে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। সেই হিসাবে প্রতি মণে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৭৫৪ টাকা।

এদিকে, সরকারি ক্রয়মূল্য প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তার সুফল পাচ্ছেন না চাষিরা। কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা পরিমাপ আর ব্যাংক হিসাবের নানা জটিলতায় পড়তে হয়। এই সুযোগে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়া সিন্ডিকেট সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ভেজা ধান কম দামে কিনে নিচ্ছে। পরে সেই ধানই শুকিয়ে চড়া দামে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে তারা।

সরকারিভাবে ৩ মে থেকে ধান কেনা শুরু হয়েছে। প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪৪০ টাকায় কিনছে সরকার। এ বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় মোট ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ইটনা (৩ হাজার ৪৭ টন) এবং অষ্টগ্রাম (২ হাজার ৫৭০ টন) উপজেলায়।

খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান হলে তা লটারির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। কৃষি অফিস থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে ধান সংগ্রহ করা হবে।

কিন্তু ইটনা উপজেলার কৃষক আকরাম হোসেন বলেন, ‘গুদামের খোলা মাঠে ধান নিয়ে রাখতে হয়। পরে তাঁদের পছন্দ না হলে আবার ফেরত নিয়ে আসতে হয় বাড়িতে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। প্রতিবছর চেষ্টা করি গুদামে ধান বিক্রি করতে। তবে নানা অজুহাতে পারি না।’

ইটনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল আকরাম বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান সংগ্রহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে, তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছেন তাঁরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হাওলাদার বলেন, রোদ না উঠলে কৃষকেরা ধান শুকাতে পারবেন না। ফলে গুদামে ধান সরবরাহের পরিমাণও কম থাকবে।

জেলা সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, কুলিয়ারচর ও নিকলী—এই পাঁচ উপজেলায় সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে ধান নেওয়া হচ্ছে না। ধান কেনা মাত্র শুরু হয়েছে।

জেলা ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, ধান সংগ্রহে কৃষকদের কোনো ধরনের হয়রানি সহ্য করা হবে না। যদি কোনো কৃষক হয়রানির শিকার হন, তবে সরাসরি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নামমাত্র দামে ধান বিক্রি করে দেনা মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন সুনামগঞ্জের কৃষকেরাও। জামালগঞ্জের হালি হাওর পারের কালীপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী আমজাদ জানান, খোরাকের আশায় জমি করেছেন তিন কিয়ার। প্রতি কিয়ারে খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকার বেশি। ধান পেয়েছেন ৩৫ মণ। ঋণ পরিশোধ করতে ৮০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

সরকারনির্ধারিত মূল্যে ধান দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে আলী আমজাদ বলেন, ‘ধান বিক্রিও করতে পারছি না, রাখতেও পারছি না। ৮০০ টাকা দামে ধান বিক্রি করলে খরচের টাকাই উঠবে না। তারপরও বিক্রি করে ঋণ মেটাতে হবে। পরে কী হবে জানি না।’

জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। কৃষকের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ ধান কিনবে সরকার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলন না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুনামগঞ্জের হালি হাওরের বড় কৃষকের একজন মো. আয়না মিয়া। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে ভিজা ধান ৬০০ টাকা দরে ৫০০ মণ বিক্রি করছি। বাদলি দেইখ্যা এই দামেই বিক্রি কইরা দিছি। এক কিয়ার জমি চাষ করতে খরচ হইছে ছয় থাইক্যা সাত হাজার টাকা। কাটাইতে লাগছে ৩ হাজার টাকা। টলি গাড়ি দিয়া খলায় আনতে বস্তা প্রতি আরও ১০০ টাকা। গোলায় তুলতেও খরচ আছে।’

উৎপাদন খরচই পড়েছে মণপ্রতি ১,২০০-১,৩০০ টাকা উল্লেখ করে আয়না মিয়া বলেন, বর্তমানে ধান বিক্রি হইতাছে আট শ-সাড়ে আট শ টাকায়। বেচতে গিয়া তিন শ-চার শ টাকা লোকসান হইতাছে। এর মাঝে ডুইব্যা ও গেরা ধানের নষ্ট হিসাব বাদ। এইবার খাইয়া না খাইয়া থাকার অবস্থা হইব অনেকের।’

সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের আহরণ ও ব্যয়ন কর্মকর্তা বি এম মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘৩ মে থেকে বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এ বছর ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান সংগ্রহ করা হবে। এ পর্যন্ত ১৫২ ধান ক্রয় করা হয়েছে। আমরা মূলত শুকনা এবং উজ্জ্বল বর্ণের ধানটা সংগ্রহ করি। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষক যে ধান নিয়ে আসতেছে, সেগুলো ভিজা। কৃষকদের ভালো করে শুকিয়ে নিয়ে আসার জন্য বলা হচ্ছে। যেহেতু আবহাওয়া ভালো, সেহেতু লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সমস্যা হবে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

গাজীপুরে ৫ হত্যা: মরদেহগুলোর ওপর ছিল লিখিত অভিযোগ, যা লেখা আছে

গাজীপুরে তিন শিশুসন্তান, স্ত্রী ও শ্যালককে হত্যা: ফোনকলে স্বীকারোক্তি দিয়ে পলাতক অভিযুক্ত

গাজীপুরে গভীর রাতে একই পরিবারের ৫ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা

আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে ভারত, বাংলাদেশের আকাশে কি তারই ঝলকানি

সংবিধি না হওয়া পর্যন্ত ববিতে শিক্ষকদের পদোন্নতি হচ্ছে না: সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত