Ajker Patrika

নীরব ক্লান্তির অদৃশ্য মাশুল ‘সুপারওম্যান সিন্ড্রোম’

ফিচার ডেস্ক
নীরব ক্লান্তির অদৃশ্য মাশুল ‘সুপারওম্যান সিন্ড্রোম’
সহজ কথায়, সুপারওম্যান সিন্ড্রোম হলো সমাজ বা নিজের চাপিয়ে দেওয়া সেই অদৃশ্য নিখুঁত হওয়ার তাড়না, যেখানে একজন নারী মনে করেন, তাকে সবকিছু একা হাতে শতভাগ নিখুঁতভাবে সামলাতে হবে। ছবি: পেক্সেলস

দিনের শেষে ক্লান্তির চাদর গায়ে জড়িয়ে পুরো পরিবার ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়। তখনো আলো জ্বলে গৃহিণী বা কর্মজীবী নারীর নিভৃত কক্ষে। শ্রান্ত শরীরে শান্ত হাতে তিনি গুছিয়ে রাখেন নিশিরাতের রান্নাঘর। মনে মনে এঁকে নেন আগামীকালের সূর্যোদয়ের ব্যস্ততম ক্যালেন্ডার। কিংবা আধবোজা চোখে জলপট্টি ছোঁয়ান জ্বরে তপ্ত পরিবারের সদস্যের কপালে।

আমাদের সমাজের প্রায় প্রতিটি পরিবারে এই চিরচেনা দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারীদের এই অপরিসীম সহ্যশক্তি আর নিঃশব্দ বিসর্জনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সংসার লক্ষ্মী’, ‘আদর্শ মাতা’ কিংবা ‘দশভুজা’। কিন্তু প্রশংসার এই জাঁকজমকপূর্ণ অলংকারে আমরা কি ভুলতেই বসেছি তাঁদের রক্তমাংসের শরীরটাকে? দেবী বানানোর এই মহিমান্বিত ছলনায় আড়াল হয়ে যাচ্ছে এক অবহেলার উপাখ্যান। যেখানে আড়ালে ক্ষয়ে যায় একেকটি মন, ক্লান্তি চেপে ধরে একেকটি মানবীয় প্রাণে।

নিজে অসুস্থ হয়েও পুরো সংসার এক হাতে টানা, সবার খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাওয়া এই মানসিকতাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘সুপারওম্যান সিন্ড্রোম’। সহজ কথায়, সুপারওম্যান সিন্ড্রোম হলো সমাজ বা নিজের চাপিয়ে দেওয়া সেই অদৃশ্য নিখুঁত হওয়ার তাড়না, যেখানে একজন নারী মনে করেন, তাঁকে একসঙ্গে চাকরি, সন্তান লালন-পালন, সংসারের দায়িত্ব, আত্মীয়তা রক্ষা—সবকিছু একা হাতে শতভাগ নিখুঁতভাবে সামলাতে হবে। কোনো সাহায্য নেওয়া যাবে না, ক্লান্ত হওয়া যাবে না এবং থামা যাবে না।

যে নারীরা সবকিছু একা সামলাতে গিয়ে সুপারওম্যান হওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে কতগুলো অদৃশ্য মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান। ছবি: পেক্সেলস
যে নারীরা সবকিছু একা সামলাতে গিয়ে সুপারওম্যান হওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে কতগুলো অদৃশ্য মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান। ছবি: পেক্সেলস

এটি কোনো সাধারণ ক্লান্তি নয়

সংসারের এই অন্তহীন কাজের মানসিক চাপ শুধু মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে আড়াই গুণ বেশি সময় অবৈতনিক সেবা ও গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘমেয়াদি যত্নদাতার মানসিক চাপ কেবল বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পরে ক্রনিক ফ্যাটিগ, তীব্র অনিদ্রা, মাইগ্রেন, মাংসপেশির ব্যথা এবং পেটের জটিলতার মতো শারীরিক ব্যাধিতে রূপ নেয়।

সুপারওম্যান হওয়ার অদৃশ্য মাশুল

যে নারীরা সবকিছু একা সামলাতে গিয়ে সুপারওম্যান হওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে কতগুলো অদৃশ্য মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান। সেগুলো হলো—

ক্রনিক স্ট্রেস ও বার্ন আউট: দিনরাত একটানা কাজের মানসিক চাপ তাঁদের শরীরে বার্ন আউট বা চরম শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি এনে দেয়। মন ও শরীরের এই সংযোগ নষ্ট হলে মনোযোগ কমে যায় এবং মেজাজ খিটখিটে হতে থাকে।

পারফেকশনিজমের ফাঁদ: তাঁদের মনে হয় সামান্য ভুল হওয়া মানেই তিনি ব্যর্থ। ফলে ছুটির দিনেও তাঁরা বিশ্রাম নিতে পারেন না।

নিজের যত্ন না নেওয়া: পরিবারের সবার যত্ন নেওয়া হলেও নিজের ওষুধ খাওয়া, সময়মতো খাওয়া বা বিশ্রামের বিষয়টি তালিকায় সবার শেষে থাকে।

অব্যক্ত ক্ষোভ ও বিষণ্নতা: মুখে কিছু না বললেও ভেতরে-ভেতরে একধরনের নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়। ‘সবাই আমার ওপর নির্ভর করে, কিন্তু আমার প্রয়োজনে কেউ নেই’—এই ভাবনা থেকে সম্পর্কে ক্ষোভ ও অপরাধবোধ জন্ম নেয়।

এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায়

সমাজ ও পরিবারকে যদি সুস্থ রাখতে হয়, তবে আগে ঘরের নারীটির মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন—

কাজের বিশদ ভাগ করে নেওয়া: সংসারে কেবল ‘সহযোগিতা’ নয়, দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। যেমন সন্তানের পড়ার দায়িত্ব বা বাজার করার দায়িত্ব পরিবারের অন্য সদস্য বা স্বামী সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে নিতে পারেন।

‘না’ বলতে শেখা: নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়া বন্ধ করতে হবে। কোনো কাজ করতে না পারলে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলা কোনো অপরাধ বা স্বার্থপরতা নয়।

নিখুঁত হওয়ার চাপ ত্যাগ করা: ঘর সব সময় চকচকে না-ও থাকতে পারে, প্রতিদিন নিয়ম মেনে সব রান্না না-ও হতে পারে। এই স্বাভাবিকতাটুকু মেনে নিতে হবে। নিখুঁত হওয়ার চেয়ে সুস্থ থাকা বেশি জরুরি।

নিজের জন্য কিছুটা সময়: দিনে অন্তত ৩০ মিনিট নিজের মতো করে কাটানো প্রয়োজন। চাইলে তা হতে পারে বই পড়ে, একটু হেঁটে বা শান্তভাবে বসে চা খেয়ে।

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া: অনিদ্রা, অতিরিক্ত বিষণ্নতা বা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত।

আমাদের বুঝতে হবে, নারীরা কোনো মেশিন বা সুপারওম্যান নন। তাঁরাও রক্তমাংসের মানুষ। তাঁদেরও ক্লান্তি আসে, তাঁদেরও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। তাঁদের নিখুঁত হওয়ার মিথ্যা প্রশংসায় না ভাসিয়ে একটু সাহায্য, সহানুভূতি এবং বিশ্রামের সুযোগ দেওয়াই হোক প্রকৃত সম্মান।

সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস ইন্টারন্যাশনাল, ইভল্যুশন ওয়েলনেস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত