Ajker Patrika

ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যে আর ভরসা রাখছে না সিআইএ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যে আর ভরসা রাখছে না সিআইএ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

বন্ধুরাষ্ট্র ও ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ইসরায়েলের মূল দাবি ছিল—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের একদম দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর সেখান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবেন—তা খুঁজে পেতে এখন হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। আর অন্যদিকে, যে ইসরায়েল ট্রাম্পকে যুদ্ধের জন্য বারবার প্ররোচিত করেছিল, তারা এখন ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা বন্ধ করে দিয়েছে।

বিগত তিন মাস ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখা এবং ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়ে নেতানিয়াহুর ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চটে আছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে (ইরানি হত্যাচেষ্টার হুমকি এড়াতে) তুরস্ক থেকে একটি গোপন সামরিক বিমানে করে পালিয়ে যান ট্রাম্প। অত্যন্ত সুকৌশলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে তিনি আঙ্কারার ন্যাটো সম্মেলন শেষে নিরাপদে ব্রিটেনে পৌঁছাতে পারেন।

তবে এই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই নিশ্চিত হতে পারেনি।

ওই ঘটনার একদিন পরই মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআইএ এই ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। তবে যেকোনো ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত ওই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবস্থা নেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে জানায়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার এই সতর্কতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি তাদের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ। আর ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এ ধরনের তথ্য কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অবগত করার জন্য দেয় না, একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে নিজেদের পছন্দমতো রূপ দেওয়ার ও চালিত করার উদ্দেশে এসব তথ্য সাজিয়ে থাকে।

চাপের মুখে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এখন চাপের মুখে পড়েছে। দুই নেতার কেউই ইরানে তাঁদের সামরিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি, উল্টো নিজেদের দেশের ভেতরের বিভাজন সামলাতেই এখন তাঁদের ঘাম ছুটছে।

১৯৭৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা দিয়ে ইরানে সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব হবে—ইসরায়েলের এমন ‘আত্মবিশ্বাসই’ মূলত সিআইএর মনে তাদের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করে দেয়।

মিলার বলেন, ‘নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে প্রায়শই গোয়েন্দা তথ্যের হিসাব-নিকাশ নিয়ে খেয়ালখুশি মতো চাল চালেন। বিশেষ করে যখন বিষয়টিতে ইরান বা হামাসের মতো চরমপন্থী পক্ষগুলো যুক্ত থাকে। তবে একই সঙ্গে, ট্রাম্পকে হত্যা করার আগের কিছু প্রচেষ্টা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্পকে হত্যার যে (আইআরজিসি কর্তৃক) চক্রান্ত প্রকাশ পেয়েছিল—সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে, সিআইএর যত সন্দেহই থাকুক না কেন, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস কোনো প্রকার ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাত না।’

‘প্রভাব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে সিআইএ’

থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়োসি মেকেলবার্গ মনে করেন, সংবাদমাধ্যমে আসা গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো দৃশ্যত যতটা সত্য মনে হয়, বিষয়টি হয়তো ততটা সরল নয়।

অধ্যাপক ইয়োসি বলেন, ‘সিআইএ হয়তো মনে করছে, তারা নীতি নির্ধারণের জায়গা থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তাই এ ধরনের কিছু বিষয় তারা সংবাদমাধ্যমে এনে নিজেদের প্রভাব পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে। আর চলমান যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কিছু ব্যর্থতা দেখা গেছে। এর একটি উদাহরণ হলো—ইরানের মিনাব স্কুল হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু। ঘটনাটি নিয়ে খোদ বর্তমানে মার্কিন সরকারই তদন্ত করছে।’

প্রসঙ্গত, ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সেকেলে বা পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মিনাবের ওই স্কুলে হামলা চালিয়েছিল। আর এই ভুলে প্রাণ যায় ১৭০ জনের বেশি শিশুর।

তবে যতই বিতর্ক থাকুক, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক এখনো ভেঙে যায়নি। গত মাসে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অষ্টম রাষ্ট্রীয় সফরে যান। এই সফর প্রমাণ করে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ নিয়ে টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সম্পর্ক একেবারে ভেঙে পড়েনি। মেকেলবার্গ ব্যাখ্যা করেন, গাজা নিয়ে ট্রাম্পের দেওয়া শান্তি পরিকল্পনা নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেখানে কখনোই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এসব নিয়ে ট্রাম্প যে নীরবতা পালন করেছেন, সেটাই তাঁদের সম্পর্কের গভীরতার প্রমাণ।

তবে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ব্যাকফুটে থাকা ট্রাম্প এবং আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে টিকে থাকার জন্য লড়াইয়ে নাস্তানাবুদ নেতানিয়াহু—উভয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই আপাতদৃষ্টিতে প্রায় অনিশ্চিত। ফলে আগামী দিনগুলোতে এই সম্পর্ক আরও চাপের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তা সত্ত্বেও সামগ্রিক কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তন এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মরান।

অধ্যাপক মরান বলেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যকে এত দিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা সেরা মানদণ্ড বলে গণ্য করা হতো। ফলে মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েলি সতর্কতায় ব্যবস্থা নিলেও প্রকাশ্যে তাঁরা যে একে বিশ্বস্ত মনে করছেন না—তা স্পষ্ট করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

অধ্যাপক মরান আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্টকে ভিন্ন বিমানে স্থানান্তরের বিষয়টি ছিল সাময়িক সতর্কতা যা, সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে তারা অস্বীকার করতে পারেনি। কিন্তু জনসম্মুখে সেই গোয়েন্দা মূল্যায়নের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ।’

মরান বলেন, ‘এটি হয়তো জনসাধারণকে আশ্বস্ত করতে করা হয়েছে যে, আসলে কোনো বিপদ ছিল না। তবে এটি এমন ইঙ্গিতও দেয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর আগের মতো আর চোখ বন্ধ করে অন্ধবিশ্বাস‌‌ রাখা হচ্ছে না। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সেই হামলার পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই এই অনাস্থা তৈরি হয়েছে।’

সবশেষে অধ্যাপক মরান বলেন, ‘আমি মনে করি না, ট্রাম্প এখনই ইসরায়েলের পাশ থেকে পুরোপুরি সরে যাবেন। তবে তাঁদের এই পারস্পরিক সমীকরণ ও সম্পর্ক দিন দিন অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।’

তথ্যসূত্র: দি ইন্ডিপেনডেন্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত