Ajker Patrika

শিশুর অভিভাবকত্বে মায়ের স্বীকৃতির দাবি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
শিশুর অভিভাবকত্বে মায়ের স্বীকৃতির দাবি
ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে শনিবার ‘শিশুর অভিভাবকত্বের বাস্তবতা, বৈষম্য ও অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

শিশুর দৈনন্দিন পরিচর্যার দায়িত্ব মায়ের ওপর থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত ক্ষমতা অনেকাংশেই তাঁর ওপর থাকে না। বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় অনেক ক্ষেত্রে শিশুর প্রকৃত পরিচর্যাকারী আইনগত অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি পান না। ফলে স্কুলে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসার সম্মতি, পাসপোর্ট, বিদেশ ভ্রমণসহ নানা প্রশাসনিক কাজে জটিলতা তৈরি হয়। এ জন্য অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে মায়ের স্বীকৃতি প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে।

আজ শনিবার ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে ‘শিশুর অভিভাবকত্বের বাস্তবতা, বৈষম্য ও অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এ সব কথা বলেন। বিচ্ছেদের পরে বাবা-মায়ের সমান দায়িত্ব এবং শিশুর অভিভাবকত্বে মায়ের স্বীকৃতির দাবি জানান তাঁরা।

‘শিশুদের অভিভাবকত্ব সম্প্রসারণ প্রস্তাব’ (সিজিইপি) নামের শিশু কল্যাণকেন্দ্রিক উদ্যোগের যাত্রা শুরু উপলক্ষে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। সংলাপের সাংগঠনিক সহযোগিতায় ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘নাগরিক কোয়ালিশন’।

সংলাপের মূল নিবন্ধে সিজিইপির গবেষক তৃষিয়া নাশতারান বলেন, বাংলাদেশের পারিবারিক আইনে শিশুর হেফাজত (কাস্টডি) ও অভিভাবকত্ব (গার্ডিয়ানশিপ) দুটি আলাদা ধারণা। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে মা শিশুর হেফাজতদার হতে পারেন, কিন্তু আইনসংগত অভিভাবক (ওয়ালি) কেবল পিতা। হিন্দু, খ্রিষ্টান ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের পারিবারিক আইনেও অভিভাবকত্বের চিত্র মোটাদাগে একই। এই ব্যবস্থার প্রশাসনিক মেরুদণ্ড ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইন।

তৃষিয়া আরও বলেন, এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন থেকে সিজিইপি উদ্যোগের সূচনা। সেটি হলো-বিদ্যমান আইনি কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে এমন কোনো নীতিগত, প্রশাসনিক বা পরিপূরক আইনি পথ তৈরি করা সম্ভব কি না, যা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে তার প্রকৃত পরিচর্যাকারীর, বিশেষত মায়ের, ন্যায্য অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে পারে।

সিজিইপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট দিলরুবা শরমিন বলেন, ’ আমরা একটি রাষ্ট্রীয় কমন (সাধারণ) আইন চাই। যে আইনের সুবিধা শহর-নগর, অর্থনৈতিক অবস্থা, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত অবস্থাসহ কোনো ধরনের ভেদাভেদ ছাড়াই সবাই পাবে। শুধু আইন বা সুবিধা দেওয়ার কথা বললেই হবে না, শেষ পর্যন্ত সবাই যেন সেই সুবিধা পায়, সেটিও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।’

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান বলেন, শিশু ভবিষ্যতের নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানেও রাষ্ট্রের দায়িত্বের আওতায় রয়েছে। তাই শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।

শিশু ও নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু ব্যক্তির চিন্তা পরিবর্তন নয়, পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিবর্তনও জরুরি বলে মন্তব্য করেন দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, অভিভাবকত্ব ও শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিশুর স্বার্থই হবে মূল বিবেচনা। ব্যক্তি, পরিবার বা কোনো পক্ষের ক্ষমতা কিংবা বিরোধের চেয়ে শিশুর নিরাপত্তা, বিকাশ ও মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সংরক্ষিত আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, সন্তানের কাস্টডি (হেফাজত) নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ‘কার কাছে সন্তান থাকবে’—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে কে কতটুকু দায়িত্ব নেবেন, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি। সন্তানের আর্থিক দায়িত্ব, উভয় অভিভাবকের সঙ্গে সম্পর্ক, দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ এবং বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ বা বিরোধ চলাকালীন সন্তানের অধিকার—সবগুলো বিষয় আইনি কাঠামোর মধ্যে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সংলাপে অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধন, শিল্পী ওয়ারদা আশরাফ, শিক্ষিকা আতকিয়া আসিমা তাজিন ও অধিকারকর্মী কানিজ ফাতিমা মিথিলা সন্তানদের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব পেতে লড়াইয়ের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, শহরের মায়েদের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারী, নারী শ্রমিক এবং গ্রামের নারীদের কথাও ভাবতে হবে। তাদের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অভিভাবকত্ব ও সন্তানের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু আদালতকেন্দ্রিক সমাধান নয়, একটি সমন্বিত সামাজিক ও আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকেই সামাজিক বৈষম্য হয়। সুতরাং অর্থনৈতিক বৈষম্যটা দূর করা প্রয়োজন।

সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হবে না বলে আশ্বস্ত করেন বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের (লিগ্যাল এইড) মহাপরিচালক মঞ্জুরুল হোসেন। পারিবারিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার কথা জানান তিনি।

সমাপনী বক্তব্যে রেহনুমা আহমেদ দেশের ভবিষ্যতের জন্য, শিশুর ভবিষ্যতের জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করা আহ্বান জানান।

সংলাপে আরও অংশ নেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, সাংবাদিক মানসুরা হোসাইন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার, সংসদ সদস্য ফাহিমা নাসরিন মুন্নী প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত