Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধেয়ে আসছে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২: ৩৪
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধেয়ে আসছে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’
চীনের কিংদাও বন্দরের তেল টার্মিনালে একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাঙ্কার। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে, শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে আর অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন—এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে পারে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

‘স্ট্যাগফ্লেশন’ শব্দটি দুটি ইংরেজি শব্দ থেকে এসেছে—স্ট্যাগনেশন (অর্থনৈতিক স্থবিরতা) ও ইনফ্লেশন (মূল্যস্ফীতি)। তবে এটি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে একই সময়ে তিনটি সমস্যা দেখা দেয়—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব ধীর বা থেমে যায়, বেকারত্ব বাড়ে এবং দাম বা মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে।

সাধারণত মন্দা মোকাবিলায় সরকার সুদের হার কমায় আর মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়ায়। কিন্তু স্ট্যাগফ্লেশনের সময় এই দুটি সমস্যা একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাজারে ধস

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ সোমবার (৯ মার্চ) বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। প্রধান তেল সূচকগুলো ইতিমধ্যে গত ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক বৃদ্ধির রেকর্ড করেছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের সূচক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) যেখানে প্রায় ৬০ ডলার ছিল, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ।

এই উল্লম্ফনের বড় কারণ ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও সমুদ্রপথে পরিবাহিত গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক সময়ে তেল উৎপাদন কমে যাওয়াও বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও জুডো ব্যাংকের উপদেষ্টা ওয়ারেন হোগান বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি সম্ভবত তেলের খরচ বৃদ্ধির সবচেয়ে হঠাৎ ও বড় ধাক্কাগুলোর একটি।

গ্যাস ও সার সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা

তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাবার থেকে শুরু করে আসবাবপত্র পর্যন্ত সব পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম এক সপ্তাহে প্রায় ৫০ সেন্ট বেড়ে গড়ে গ্যালনপ্রতি ৩ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছেছে।

ইউরোপেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের অধিকাংশ তেল ও গ্যাস আমদানি করে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে।

চীনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বেশি থাকলে চীনের উৎপাদক পর্যায়ের মূল্যসূচক প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় এক ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদেরা।

স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি

তেলের দাম দ্রুত বাড়লে সাধারণত অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ, এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, ব্যবসা ধীর হয়ে যায়, আবার একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও বাড়ে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম যদি ১০ শতাংশ বাড়ে, তবে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

ইউরোপের অর্থনীতি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘ হলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোজোনে প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বা তারও কমে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এশিয়ার অর্থনীতিগুলো সম্প্রতি প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধির কারণে ভালো করছিল। কিন্তু বড় ধরনের জ্বালানিসংকট সেই গতি থামিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলারে পৌঁছায়, তাহলে দেশটির জিডিপি প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে, আবার মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে বলে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করেছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়ে উন্নত অর্থনীতিগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য মন্দায় পড়েছিল।

সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনাও পিছিয়ে যেতে পারে। বরং অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।

যেমন ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে ২০২৬ সালে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার কথা ভেবেছিল; কিন্তু এখন আগামী এক বছরে অন্তত একবার সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে আগে ২০২৬ সালে দুবার সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা ছিল। এখন ধারণা করা হচ্ছে, ফেডারেল রিজার্ভ হয়তো বছরের অনেক পরে একবার মাত্র সুদ কমাতে পারে।

পরিস্থিতি কতটা খারাপ হতে পারে

অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও তেলের দাম সহজে আগের স্তরে নামবে না। কারণ, বাজারে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি হিসাব করেই ব্যবসায়ীরা দাম নির্ধারণ করবেন।

ইতিমধ্যে অনেক দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি এক মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে এবং বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি তিন মাস ধরে সরবরাহ বিঘ্নিত থাকলে তেলের দাম ১৮৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নৌ-পুলিশপ্রধানসহ পুলিশের ৫ অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসর

ইরানি তেলের ডিপোতে হামলার পর ইসরায়েলকে ‘হোয়াট দ্য ফা**’ বার্তা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান: ড্রোন-হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি, আটক ও অস্ত্র উদ্ধার

ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকে জেলগেটে বরণ করলেন বিএনপির এমপি

নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় চান প্রতিমন্ত্রী, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কমিটি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত