Ajker Patrika

ট্রাম্প বলুক আর না বলুক—ইরানকে মুক্ত করতে চায় কুর্দিরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২: ৩৫
ট্রাম্প বলুক আর না বলুক—ইরানকে মুক্ত করতে চায় কুর্দিরা
কুর্দি যোদ্ধাদের একটি দল। ছবি: দ্য টাইমস

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতির নতুন এক সম্ভাব্য অধ্যায় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন যুদ্ধে অভিজ্ঞ কুর্দি যোদ্ধাদের একটি অংশ বলছে, তারা প্রয়োজনে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক, যে কোনো মূল্যে তারা ইরানকে মুক্ত করতে চায়।

ইরান সীমান্তের কাছে ইরাকি কুর্দিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানরত এক কুর্দি যোদ্ধা আমির আজিজি বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করার ডাক এলে আমি অবশ্যই যাব। এই ডাক কার কাছ থেকে আসছে, তা বড় কথা নয়—এই ডাক আমার হৃদয় থেকেই আসে।’

২৭ বছর বয়সী আজিজি কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি (পিএকে) নামের একটি ইরানি কুর্দি গেরিলা সংগঠনের সদস্য। সংগঠনটি ‘পেশমার্গা’ নামে পরিচিত বিভিন্ন কুর্দি যোদ্ধা গোষ্ঠীর জোটের অংশ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

সোমবার (৯ মার্চ) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানিয়েছে, গত কয়েক দশকে এসব কুর্দি যোদ্ধাকে লড়তে হয়েছে নানা শক্তির বিরুদ্ধে। ইরাক, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান, ইসলামিক স্টেট (আইএস) এমনকি কখনো কখনো নিজেদের মধ্যেও তাঁরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। কুর্দি রাজনীতি ও সামরিক জোটগুলো অনেক সময় বিভক্ত এবং মতাদর্শগতভাবে পরস্পর থেকে ভিন্ন।

আজিজি ২০১৭ সালে সংগঠনে যোগ দেন। সে সময় তিনি নিজের ইরানি শহর ছেড়ে উত্তর ইরাকে আইএস-এর বিরুদ্ধে লড়াই করা কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে সংহতি জানাতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘একজন কুর্দির আত্মার ভেতরেই পেশমার্গা আছে। নিজের ভূমি রক্ষা করতে চায় না—এমন কুর্দি পাওয়া কঠিন।’

২০১৭ সালে ইরাকের কিরকুকে কুর্দি যোদ্ধারা। ছবি: দ্য টাইমস
২০১৭ সালে ইরাকের কিরকুকে কুর্দি যোদ্ধারা। ছবি: দ্য টাইমস

আজিজি ইরাকের কিরকুকের পশ্চিমে হাওইজা এলাকায় আইএসের বিরুদ্ধে শেষ দিকের এক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরে তাঁকে লড়তে হয় ইরান-সমর্থিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া ‘হাশদ আল-শাবি’-এর বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালে এই বাহিনী কিরকুক শহরটি কুর্দি আঞ্চলিক সরকারের কাছ থেকে দখল করে নিয়েছিল।

আজিজি ও তাঁর সহযোদ্ধারা এখন ইরানের ভেতরেই যুদ্ধ নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তাঁদের দাবি, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিমান হামলা বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইরানি বাহিনীর পক্ষে তাদের প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।

তবে বাস্তবে এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন কুর্দি গোষ্ঠীর যোদ্ধা সংখ্যা খুব বেশি নয়। ধারণা করা হয়, ইরাকভিত্তিক প্রধান কুর্দি গেরিলা সংগঠনগুলো মিলিয়ে মোট যোদ্ধা সংখ্যা প্রায় পাঁচ থেকে দশ হাজারের মধ্যে।

সহযোদ্ধার সঙ্গে আমির আজিজি (ডানে)। ছবি: দ্য টাইমস
সহযোদ্ধার সঙ্গে আমির আজিজি (ডানে)। ছবি: দ্য টাইমস

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কয়েক মাস ধরে এসব গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কুর্দি সংগঠনগুলো এই দাবি অস্বীকার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শুরুর দিকে ট্রাম্প কুর্দি যোদ্ধাদের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তারা যদি তা করতে চায়, আমি অবশ্যই সমর্থন করব।’

কিন্তু পরে নিজের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ ইতিমধ্যে যথেষ্ট জটিল। এর মধ্যে কুর্দিদের যুক্ত করা ঠিক হবে না।’

বিশ্লেষকদের মতে, কুর্দিদের এই সম্ভাব্য তৎপরতার আলোচনা হয়তো ইরানের সামরিক নেতৃত্বকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশলও হতে পারে। এতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বাহিনীকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মনোযোগ দিতে বাধ্য করা যেতে পারে, যেখানে প্রায় এক কোটি কুর্দি বসবাস করে।

২০১৭ সালে কুর্দি বাহিনীর হাতে আটক কয়েক আইএস যোদ্ধা। ছবি: দ্য টাইমস
২০১৭ সালে কুর্দি বাহিনীর হাতে আটক কয়েক আইএস যোদ্ধা। ছবি: দ্য টাইমস

কুর্দি সংগঠনগুলোর দাবি, তারা ইরানে অভিযান চালাতে চাইলে অন্তত একটি ‘নো-ফ্লাই জোন’ প্রয়োজন। কুর্দি সংগঠন পিএকে-এর মুখপাত্র হানা ইয়াজদানপানাহ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া আমরা যদি একা ইরানে প্রবেশ করি, তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’

ইরান ইতিমধ্যে ইরাকের ভেতরে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এমন এক হামলায় পেশমার্গা যোদ্ধা জেলাল রাশিদি নিহত হন। তিনি তিন বছরের সন্তানের বাবা ছিলেন।

ইরাকের কুর্দি নেতারাও এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মাসুদ বারজানি এবং প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তানের নেতা বাফেল তালাবানি—দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনই পতনের দ্বারপ্রান্তে নেই, তাই সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে ইরাকি কুর্দিস্তানের বড় ক্ষতি হতে পারে।

গত নভেম্বরে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মাসুদ বারজানি (মাঝে)। ছবি: দ্য টাইমস
গত নভেম্বরে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মাসুদ বারজানি (মাঝে)। ছবি: দ্য টাইমস

ইতিহাস বলছে, কুর্দিরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলায় ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের নিজেদের কোনো রাষ্ট্র নেই। তবুও অনেক কুর্দি যোদ্ধা মনে করেন, একদিন তারা স্বাধীনতা বা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।

আমির আজিজি বলেন, ‘অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পেশমার্গাদের জন্য মনোবল ও আত্মাই সবচেয়ে বড় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আমাদের সমর্থন করুক বা না করুক—আমরা ভবিষ্যতে বিশ্বাস করি।’

কুর্দিদের জন্য সেই ভবিষ্যৎ এখনো দূরের এক আশার নাম।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নৌ-পুলিশপ্রধানসহ পুলিশের ৫ অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসর

ইরানি তেলের ডিপোতে হামলার পর ইসরায়েলকে ‘হোয়াট দ্য ফা**’ বার্তা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান: ড্রোন-হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি, আটক ও অস্ত্র উদ্ধার

ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকে জেলগেটে বরণ করলেন বিএনপির এমপি

নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় চান প্রতিমন্ত্রী, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কমিটি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত