Ajker Patrika

বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সব ধ্বংসের পথ বেছে নেবে তেহরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২: ২৮
বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সব ধ্বংসের পথ বেছে নেবে তেহরান
ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পালাবদল ঘটেছে। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মুজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রণকৌশলে এক ভয়াবহ পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের প্রভাষক রব গিস্ট পিনফোল্ড আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান কেবল মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে—তেহরানের এমন দাবি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি মনে করেন, ইরান প্রকৃতপক্ষে পরিকল্পিতভাবে বড় ধরনের অবকাঠামো এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে আঘাত করছে। পিনফোল্ড বলেন, ‘এটি কোনো ভুল নয়, বরং সুপরিকল্পিত কৌশল।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান অতীতে যুদ্ধের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি বা ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করত। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব সেই পথ থেকে সরে এসেছে। পিনফোল্ড ব্যাখ্যা করেন, ইরান এখন যতটা সম্ভব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পুরো অঞ্চল এবং বৈশ্বিক বাজারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো—বিশ্ব অর্থনীতি এবং জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর ওপর আঘাত হানা। তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে এই সংঘাতকে আর লাভজনক মনে না করে এবং যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটে।

ইরান বর্তমানে জিসিসিভুক্ত প্রতিটি দেশকেই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তারা তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতেও দ্বিধা করছে না। পিনফোল্ড বলেন, এই অনিশ্চিত ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কৌশল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ইরানের অস্তিত্ব এখন সংকটের মুখে। তাদের জন্য এটি এখন ‘জীবন-মরণ’ বা ‘ডু-অর-ডাই’ মুহূর্ত।

প্রসঙ্গত, জিসিসি বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ হলো মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি আরব রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক জোট। এই জোটটি ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদস্য দেশগুলো হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান।

চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো কেবল তেল ও গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করতেই বাধ্য হয়নি, বরং এখন তাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য পানি ও খাদ্য নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পারস্য উপসাগরীয় উপকূলজুড়ে বর্তমানে ৪০০-এর বেশি পানি লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে। এই প্ল্যান্টগুলো শিল্পকারখানা সচল রাখা, গলফ কোর্স সবুজ রাখা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যবহৃত হয়।

ইউএন ইউনিভার্সিটির পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ইরান যদি এই স্থাপনাগুলোতে হামলা শুরু করে, তবে তা হবে পুরোপুরি ধ্বংসাত্মক। সমুদ্র উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই অবকাঠামোগুলো এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।’

একটা সময় সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির বিশাল ভান্ডার ছিল। কিন্তু বেদুইন সমাজ থেকে আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় সেই পানি ফুরিয়ে গেছে। এখন এই দেশগুলো পুরোপুরি সমুদ্রের পানির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে—কুয়েতের ৯০ শতাংশ, ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪২ শতাংশ পানীয় জল সরবরাহ করা হয় সমুদ্রের পানি পরিশোধনের মাধ্যমে।

ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, কাতার ও বাহরাইনের মতো ছোট দেশগুলোর কাছে যে কৌশলগত মজুত রয়েছে, হামলা হলে তা কয়েক দিনেই ফুরিয়ে যাবে। বসন্ত ও গ্রীষ্মের আগমনে পানির চাহিদা আরও বাড়বে, কিন্তু এই স্থাপনাগুলো আক্রান্ত হলে দেশগুলোর কাছে বিকল্প কোনো পরিকল্পনা নেই।

পানির পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো খাদ্য সংকটের মুখেও পড়তে যাচ্ছে। এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আমদানি করে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানিনির্ভর এই অর্থনৈতিক মডেল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

লেডেন ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্রিশ্চিয়ান হেন্ডারসন বলেন, ‘আমদানি পথের বন্ধ হয়ে যাওয়া বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাবে। যদিও আরব আমিরাতসহ কিছু দেশ তিন থেকে ছয় মাসের জন্য জরুরি খাদ্য মজুত করেছে, তবে আতঙ্কিত হয়ে বেশি কেনাকাটা শুরু হলে পরিস্থিতি জটিল হবে।’

উল্লেখ্য, আমিরাত ও সৌদি আরবের ডেইরি খাতের গরুর খাবারের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিমান ও নৌপথ বন্ধ থাকলে এই চেইন ভেঙে পড়বে।

এ ছাড়া জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যের দাম ব্যাপক হারে বাড়বে। এখন পণ্য আমদানির জন্য সৌদি আরবের জেদ্দা বা ওমানের সোহর বন্দরের মতো বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে, যা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল করে তুলবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন পর্যন্ত পানি শোধনাগারগুলোর হামলা না চালিয়ে এক ধরনের সংযম প্রদর্শন করছে। তারা মূলত জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন রাডারগুলোতে আঘাত করে দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে। গত শুক্রবার বাহরাইনের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা এর বড় প্রমাণ। তবে যুদ্ধের দামামা আরও বাড়লে ইরান এই ‘ওয়াটার কার্ড’ ব্যবহার করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে এক মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নৌ-পুলিশপ্রধানসহ পুলিশের ৫ অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসর

ইরানি তেলের ডিপোতে হামলার পর ইসরায়েলকে ‘হোয়াট দ্য ফা**’ বার্তা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান: ড্রোন-হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি, আটক ও অস্ত্র উদ্ধার

ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকে জেলগেটে বরণ করলেন বিএনপির এমপি

নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় চান প্রতিমন্ত্রী, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কমিটি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত