Ajker Patrika

রাতভর বসত পুঁথির আসর, সময়ের স্রোতে হারাচ্ছে সেই ঐতিহ্য

ঝুলন দত্ত, কাপ্তাই ( রাঙামাটি)
রাতভর বসত পুঁথির আসর, সময়ের স্রোতে হারাচ্ছে সেই ঐতিহ্য
কাপ্তাই উপজেলার মিশন এলাকায় গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় পুঁথি পাঠের একটি আসর। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘ফণী যে’য়ে দংশিয়াছে মম শিরোমণি, ফিরিয়া করহ কৃপা আস্তিক জননী। ফাঁপর হয়েছি মাত, শুন বিষহরী, ফণিরূপা ফির তুমি হংসপৃষ্ঠে চড়ি। বাপে সমর্পিল মোরে লক্ষ্মীন্দর করে।’ ৬১ বছর বয়সী মীনা দে সুর করে এভাবেই পুঁথি পাঠ করছিলেন রাইখালীর ঐতিহ্যবাহী ত্রিপুরা সুন্দরী কালী মন্দিরে। তিনি রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী বাজারের বাসিন্দা। তাঁর সঙ্গে অন্য নারীরা সমবেত কণ্ঠে দোহার দিচ্ছিলেন। জোড়খাই, করতাল ও হারমোনিয়ামের সুরে মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম আবহ।

মীনা দে জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি মনসা পুঁথি ও জাগরণ পুঁথি পাঠ করে আসছেন। দুর্গাপূজার সময় জাগরণ পুঁথি পাঠ করা হয়। একসময় পাড়ায় পাড়ায় মাইকে পুঁথি পাঠের খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ মন্দিরে এসে তা শুনতেন। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পুঁথি পাঠ অনেক কমে গেছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরও পুঁথি পাঠে আগ্রহ নেই।’

একসময় শ্রাবণ মাসের প্রথম দিন থেকে পুরো মাসজুড়ে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় বসত পুঁথি পাঠের আসর। কখনো কারও বাড়িতে, কখনো মন্দিরে রাতভর চলত মনসা পুঁথি পাঠ। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দেবী মনসাকে সন্তুষ্ট করা এবং সর্পদংশন থেকে মুক্তির কামনায় এ পুঁথি পাঠের আয়োজন করতেন।

মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান দেবতা সর্পদেবী মনসা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে মনসা পূজার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এ পূজাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে মনসা পুঁথি পাঠের সংস্কৃতি।

১৮ আগস্ট মনসা পূজা। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু এলাকায় মনসা পূজায় পাঁঠা বলির প্রচলনও রয়েছে।

স্মৃতিতে সেই পুঁথির আসর

কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন মন্দির ও সনাতন পল্লীতে ঘুরে পুঁথি পাঠের অতীত ঐতিহ্যের নানা স্মৃতি পাওয়া যায়। কেপিএম কয়লার ডিপু এলাকার ৬০ বছর বয়সী স্বপ্না মল্লিক ও ৫৬ বছর বয়সী রণধীর চক্রবর্তী জানান, স্কুলজীবন থেকেই তাঁরা পুঁথি পাঠের সঙ্গে যুক্ত।

তাঁরা বলেন, প্রথম দিকে বিভিন্ন পুঁথি পাঠকের সঙ্গে দোহার হিসেবে কাজ করতেন। পরে ধীরে ধীরে মনসা পুঁথির বিভিন্ন ঘোষা, লাচার ও পয়ার মুখস্থ করেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে তাঁরা পুঁথি পাঠ করেছেন। তবে বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো কণ্ঠে সুর ধরে না।

স্বপ্না মল্লিক ও রণধীর চক্রবর্তী বলেন, একসময় কেপিএম হরিমন্দিরের কীর্তনের দল শ্রাবণ মাসজুড়ে ঘরে ঘরে ও মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে পুঁথি পাঠ করত। এখন মাঝেমধ্যে পুঁথি পাঠের আসর বসলেও আগের তুলনায় তা অনেক কমে গেছে।

কাপ্তাইয়ের কয়লার ডিপুর অঞ্জনা মল্লিক, চন্দ্রঘোনা মিশন এলাকার মিতা দাশ, কৃষ্ণা দাশ এবং রাইখালী বাজারের বকুল বালা জানান, তাঁরা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মনসা পুঁথি ও জাগরণ পুঁথি পাঠ করে আসছেন।

তাঁরা বলেন, একসময় তাঁদের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জনের নারী দল এবং বাদকের দল থাকত। পুঁথি পাঠের সেই আয়োজন ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু এখন আর আগের মতো নিয়মিত পুঁথি পাঠের আসর বসে না। কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে দু-একটি বাড়িতে এ ধরনের আয়োজন হয়।

গানের সুরে পুঁথি পাঠ

কাপ্তাইয়ের বাউল শিল্পী বসুদেব মল্লিক, গীতাশিক্ষক অনিন্দ্য পাল ও পুঁথি পাঠক আশুতোষ মল্লিক জানান, শ্রাবণ মাসজুড়ে বিভিন্ন গানের সুরে পুঁথি পাঠের প্রচলন রয়েছে। ধর্মীয় গান, কীর্তন, রাধা-বিচ্ছেদের গান, নিমাই সন্ন্যাসের গান ছাড়াও আধুনিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গানের সুরে পুঁথি পাঠ করা হয়।

তাঁদের ভাষ্য, ‘জয় জগদীশ’, ‘ভব সাগর তারণ’, ‘বৃন্দাবনে চল’, ‘রাধা বিচ্ছেদের গান’, ‘নিমাই সন্ন্যাসের গান’-এর পাশাপাশি ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এই গান’সহ বিভিন্ন আধুনিক গান এবং ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’, ‘ও সুজন সখিরে’, ‘মধু কই কই বিষ খাওয়ালা’, ‘ওরে কালা ভ্রমরা’সহ আঞ্চলিক গানের সুরেও পুঁথি পাঠ করা হয়।

তাঁরা জানান, আগের বছরগুলোতে মনসা পুঁথি পাঠকে ঘিরে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন আর আগের মতো পুঁথি পাঠের আয়োজন হয় না।

হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোককবি চট্টগ্রামের কবিয়াল কল্পতরু ভট্টাচার্য ও বিশিষ্ট কীর্তনিয়া প্রফুল্ল রঞ্জন শীল বলেন, মনসা পুঁথি বাংলা লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। শ্রাবণ মাসজুড়ে সনাতন পল্লিগুলোতে একসময় পুঁথি পাঠের আসর বসত। মানুষ রাত জেগে এসব আসর উপভোগ করত।

তাঁরা বলেন, ‘যুগের হাওয়ায় এখন সবকিছু বদলে গেছে। পুঁথি পাঠ যে একটি লোকজ সংস্কৃতি, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সেটিই জানে না।’

কালের বিবর্তনে বিনোদনের ধরন বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনও। সেই পরিবর্তনের স্রোতে একসময় গ্রামের মানুষের রাতজাগা আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ পুঁথি পাঠের আসরও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত সেই সুর, সেই আয়োজন, সেই রাতভর আসর। কিন্তু নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে ঐতিহ্যবাহী এই লোকজ সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত