নাটোরের গুরুদাসপুর: বাবা এমপি, ছেলেরা বেপরোয়া

মোগল সম্রাট শাহজাহানের জীবদ্দশাতেই সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর দুই ছেলে দারাশিকোহ ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে শুরু হয়েছিল ক্ষমতার লড়াই। নাটোরের গুরুদাসপুরের ‘সিংহাসন’ (এমপির কর্তৃত্ব) নিয়ে তেমনই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের দুই ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ও মাহমুদুজ্জামান সোহাগ।
এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধে ছোট ভাই সোহাগের অনুসারী ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামকে (৩২) বড় ভাই মিন্টু খুন করিয়েছেন বলে অভিযোগ
উঠেছে। এ ঘটনায় মিন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এখন দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের নানা অভিযোগ সামনে আসছে। ছেলেদের এবং নিজের কর্মকাণ্ডে চাপে পড়েছেন সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজও।
টার্গেট খুঁজছিলেন সোহাগও গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ১৪ অক্টোবর রাতে হামলার শিকার হন। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। অনুসারী শাকিলের ওপর হামলা হওয়ার আগে নিজের ‘টার্গেটকে’ খুঁজছিলেন সোহাগও। তাঁর টার্গেট উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সুজাউদ্দৌলা সুজন।
সুজন দাবি করেন, পূর্ববিরোধের জেরে ১২ অক্টোবর রাতে সোহাগ তাঁকে মোবাইলে হুমকি দেন। পরে তিনি যেখানে ছিলেন, সেখানে সশস্ত্র অবস্থায় দলবল নিয়ে আসেন। তবে এর দুই মিনিট আগে তিনি স্থান ত্যাগ করায় বেঁচে গেছেন। সুজনের ভাষ্য, ‘আমি এখন জান হাতে নিয়ে ঘুরছি।’
এদিকে শাকিলের ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপি কর্মী শাহ আলম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে ১৮ অক্টোবর নয়াবাজারে এমপিপুত্র মিন্টুর নেতৃত্বে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
শাহ আলমের দাবি, শাকিলের ওপর হামলার প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে। এলাকার মানুষ এখন এমপির দুই ছেলের কাছে জিম্মি।
বাবার জন্যই বেপরোয়া মিন্টু
গুরুদাসপুরের দলীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, আব্দুল আজিজ এমপি হওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে মিন্টু মাদকাসক্ত এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তা ছাড়া চাঁদাবাজি করে বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন।
উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সুজাউদ্দৌলা সুজন বললেন, মিন্টু আগে থেকে রাজনীতি করতেন। তাঁর ছোট ভাই সোহাগ আগে কখনো রাজনীতি করেননি। তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে নামেন। এমপি হওয়ার পর আব্দুল আজিজ তাঁকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। তিনি উপজেলা নিয়ন্ত্রণে নেন। এমনকি সোহাগকে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী করারও সিদ্ধান্ত নেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্টু অপরাধজগতে চলে যান।’
মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁর ভাই সোহাগ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সম্পাদক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির এক নেতা জানান, দুই ভাইয়ের দা-কুমড়া সম্পর্ক। এ জন্য মিন্টু বাড়ি ছেড়ে উপজেলা সদরে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন। সম্প্রতি সার ডিলার নিয়োগে ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ডিলারশিপ পেয়েছেন সোহাগের ভায়রা ভাইও। মিন্টু নিজে একটি ডিলারশিপ পেলেও টাকার ভাগ পাননি।
বিএনপির ওই নেতা বলেন, দুই উপজেলার সব সরকারি অফিস ছোট ছেলে সোহাগের নিয়ন্ত্রণে। ঠিকাদারিও করছেন বেনামে। এসব নিয়ে মিন্টুর সঙ্গে সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে। সম্প্রতি একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে দুই ভাই প্রকাশ্যেই বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মঞ্চের পেছনে গিয়ে তাঁরা একে অপরকে পিস্তল দেখান। এই পরিস্থিতিতে পুরস্কার বিতরণ না করেই মঞ্চ থেকে চলে যান এমপি আব্দুল আজিজ।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার সোহাগকে ফোন করা হলে তিনি ওই অনুষ্ঠানেই যাননি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘দলের ভেতরে বিরোধী পক্ষ আছে। জামায়াত-আওয়ামী লীগ আছে। তারা এখন নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে। আসলে এগুলোর কোনো কিছুরই ভিত্তি নেই।’
এলাকায় মিন্টুর দখলদারত্ব
স্থানীয়রা বলছেন, আব্দুল আজিজ এমপি হওয়ার পর এলাকার যেখানেই অবৈধ পুকুর খনন হয়েছে, সেখানেই ভাগ বসিয়েছেন নুরুজ্জামান মিন্টু। পুকুরের মাটি বিক্রি করে তিনি অঢেল টাকা পকেটে পুরেছেন। যত দিন তিনি মাটি বিক্রি করেছেন, তত দিন উপজেলা প্রশাসনকে কোনো অভিযান চালাতে দেননি।
তিন মাস আগে গুরুদাসপুরের ধারবাড়িয়া এলাকায় প্রায় ১১ বিঘা জমিতে পুকুর কেটেছেন রোফাতুল্লাহ সরকার। তিনি জানালেন, কাজ শুরু করতেই মিন্টু গিয়ে সেখানে হাজির হন এবং জানান, মাটি তিনি বিক্রি করবেন। এরপর সেখান থেকে ৪ হাজার ২০০ ট্রাক্টর মাটি তিনি ইটভাটায় দিয়েছেন। প্রতি গাড়ি মাটি বিক্রি করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকায়। এখান থেকে মিন্টু প্রায় ৬০ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
রোফাতুল্লাহর ভাষ্য, যত দিন মাটি কাটা হয়েছে, তত দিন তাঁকে পুকুরেই যেতে দেওয়া হয়নি। সব সময় মিন্টুর ১০-১২ জন লোক থেকেছেন। পুকুর খনন শেষে তিনি তাঁর খালাতো ভাই ফারুক হোসেনকে দিয়ে অনুরোধ করিয়েছিলেন, যেন ভেকু ভাড়ার ৯ লাখ টাকা মিন্টু দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্টু পুলিশ দিয়ে তাঁকে ধরিয়ে মাদকসেবী সাজিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নিয়েছেন। ৪ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। মাটি বিক্রি যেদিন শেষ হয়েছে, সেদিন ইউএনওকে দিয়ে ভেকুও জব্দ করিয়েছেন।
শাকিল খুনের নেপথ্যে
ছাত্রদল নেতা শাকিল খুনের কারণ খুঁজতে গুরুদাসপুরের ১০ জন নেতা-কর্মী এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে আজকের পত্রিকা। তাঁরা জানিয়েছেন, শাকিল ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত নুরুজ্জামান মিন্টুর সঙ্গেই রাজনীতি করতেন। কিন্তু সোহাগ রাজনীতিতে নামলে তিনি তাঁর সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন মিন্টু।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মিন্টু এলাকার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। কয়েক মাস আগে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে ৮ লাখ টাকার একটি ইয়াবার চালান গুরুদাসপুরে আসে। শাকিল এই ইয়াবার চালানের টাকা মেরে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন মিন্টু। এ কারণেই মিন্টু তাঁকে ‘শায়েস্তা’ করার পরিকল্পনা করেন।
এই অবস্থায় ২০ এপ্রিল শাকিল ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘এ বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডায়েরি করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে ওই ডায়েরি অনুযায়ী মামলা করে দিবেন।’
তবে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ‘এ ধরনের কোনো জিডির হদিস পাওয়া যায়নি।’
আলোচনায় ‘চাটা গ্রুপ’
শাকিলের মৃত্যুর পর গুরুদাসপুরে আলোচনায় এসেছে ‘চাটা গ্রুপ’ নামের একটি বাহিনী। শাকিলের বাবা রবিউল করিমের দাবি, শাকিল জীবিত অবস্থায় জানিয়েছিলেন, চাটা গ্রুপের সদস্য ইরফান নেওয়াজ ও মো. হাবিব তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছিল। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমেরিকাপ্রবাসী স্থানীয় ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইনের অনুসারীদের এলাকায় ‘চাটা’ বলা হয়। এমপিপুত্র মিন্টু চাটা গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
রাসেল হোসাইন গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা ইউনিয়নের কচুগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় ব্যবসা করেন। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি ওই দলের নেতাদের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন। গুরুদাসপুর উপজেলা সদর চাঁচকৈড় বাজারে তাঁর একটি শপিং মল রয়েছে। শাকিলের লাশ দাফন শেষে এই শপিং মলে হামলা চালানো হয়।
নাটোর জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মাদকসংশ্লিষ্ট কারণে শাকিলকে শায়েস্তা করতে মিন্টু চাটা গ্রুপকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে অর্থের জোগান দেন আমেরিকাপ্রবাসী ব্যবসায়ী রাসেল হোসাইন।’
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয় রাসেল হোসাইনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি কেন অর্থের জোগান দিতে যাব? আসলে আমার ওপর দোষ চাপিয়ে এমপির পরিবার দায়মুক্তি পেতে চাচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘অভ্যুত্থানের পর থেকে গ্রামের বাড়ি-গাড়ি রক্ষায় আমি চাঁদা দিতে দিতে অস্থির। মিন্টু দফায় দফায় টাকা নিয়েছেন। ভোটের সময় তাঁর বাবাও আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁর নির্বাচনে আমাকে ৩০-৩৫ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে।’
আরও দুজন হেফাজতে
শাকিল হত্যা মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম। আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জেলা ডিবির পরিদর্শক নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনিসুর রহমান ও আল-আমিন নামের দুজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁরা চাটা গ্রুপের সদস্য।
এদিকে নাটোর প্রতিনিধি জানান, তিন দিনের রিমান্ড শেষে এমপিপুত্র মিন্টুকে গতকাল বিকেলে আদালতে তোলা হয়। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর আরও সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। তবে আদালতে শুনানি হয়নি। ডিবির পরিদর্শক নজরুল ইসলাম জানান, রিমান্ড আবেদনের শুনানি পরে হবে। আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।









