Ajker Patrika

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের ১৫ আমল

হাফেজ মাওলানা আজিজুল হক
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের ১৫ আমল

জিলহজ ইসলামের অন্যতম সম্মানিত ও ফজিলতপূর্ণ মাস, যা আমাদের মাঝে নিয়ে আসে পবিত্র হজ ও মহান ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কোরবানি। পবিত্র কোরআনে এই মাসের প্রথম ১০ রাতকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বছরের অন্যান্য সাধারণ দিনের তুলনায় জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা সুরা ফজরে এই ১০ রাতের কসম খেয়েছেন, যা এর শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য নিদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল আল্লাহর নিকট বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রিয় ও সওয়াবের।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)

এই বরকতময় সময়ের বিশেষ কিছু আমল নিচে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:

১. তওবা ও ইস্তিগফার করা

জিলহজ যেহেতু গুনাহ মাফের মাস, তাই বিগত জীবনের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে তওবা করা উচিত। তওবা হলো পাপকর্ম থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পুনরায় সেই গুনাহ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার করা। এটি একজন মুমিনকে নিষ্পাপ ও নিষ্কলুষ জীবনের পথে অনুপ্রাণিত করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তাঁর কাছেই ফিরে এসো। নিশ্চয়ই তোমার রব অতি দয়ালু ও অধিক মমতাময়।’ (সুরা হুদ: ৯০)

২. জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা

ইসলামের পরিভাষায় বছরের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো হলো জিলহজের প্রথম দশক। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখতেন। হজরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি আমল কখনো পরিত্যাগ করেননি—আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা (১০ তারিখ ব্যতীত), প্রতি মাসে আইয়ামে বিজের রোজা এবং ফজরের সুন্নত নামাজ। (সুনানে আবু দাউদ: ২১০৬)

৩. আরাফার দিনের রোজা

জিলহজের প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনটি বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। এ দিনে দোয়া-দরুদ ও ইবাদতে মশগুল থাকা উচিত। বিশেষ করে এ দিন রোজা রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে তিনি এর মাধ্যমে বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

৪. চুল ও নখ না কাটা

জিলহজের অন্যতম সুন্নত আমল হলো—চাঁদ দেখা দেওয়ার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নখ, চুল বা গোঁফ না কাটা। এতে হাজিদের সঙ্গে একপ্রকার সাদৃশ্য তৈরি হয় এবং বিশেষ সওয়াব হাসিল হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখবে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোরবানি করবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)। তাই জিলহজ আসার আগেই প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সেরে নেওয়া উত্তম। যাঁরা কোরবানি দিতে পারছেন না, তাঁরাও এই আমলটি করলে কোরবানির সওয়াব হাসিল করবেন ইনশা আল্লাহ।

৫. অধিক পরিমাণে জিকির করা

জিলহজ মাসের অন্যতম আমল হলো আল্লাহর জিকির। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেন তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সুরা হজ: ২৮)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, আয়াতে ‘নির্দিষ্ট দিন’ বলতে জিলহজের প্রথম ১০ দিনকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসির)

৬. নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া

এই দশকের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তাই ফরজ ইবাদতগুলো সময়মতো আদায়ের পাশাপাশি সব ধরনের পাপাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নফল ইবাদত এই সময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে সর্বদা আমার সান্নিধ্য লাভ করতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে আমার প্রিয় পাত্রে পরিণত করি।’ (সহিহ বুখারি: ৬৫০২)

৭. তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা

জিলহজের দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘তাহলিল’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), ‘তাকবির’ (আল্লাহু আকবার) এবং ‘তাহমিদ’ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করার বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এই ১০ দিনে তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ বৃদ্ধি করো।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৪৬)

৮. তাকবিরে তাশরিক আদায় করা

৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত—এই পাঁচ দিন মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ বলা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব। তাকবিরটি হলো—‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ নামাজ জামাতে হোক বা একাকী, এই তাকবির পাঠ করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার)

৯. দোয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করা

দোয়া ইবাদতের মূল এবং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সেতুবন্ধন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিন: ৬০)। জিলহজের প্রথম নয় দিন যাঁরা রোজা রাখবেন, তাঁদের জন্য ইফতারের পূর্বমুহূর্ত দোয়া কবুলের এক বিশেষ সময়। এ ছাড়া বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে এই সময়ে বেশি বেশি মোনাজাত করা বাঞ্ছনীয়।

১০. সামর্থ্যবান হলে হজ করা

হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ এবং একটি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। জিলহজ মাসেই ইসলামের এই মহান রুকনটি পালন করতে হয়। সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজের মাধ্যমে মানুষ পাপমুক্ত হয়ে নতুন জীবনের প্রেরণা পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাবরুর হজ তথা কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)

১১. সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করা

কোরবানি আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহান ইবাদত, যা সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। এটি মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনে পশু কোরবানি করার চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম, ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (জামে তিরমিজি: ১৪৯৩)

১২. আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করা

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইমানের অপরিহার্য অংশ। এটি রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি করে এবং জান্নাতের পথ সুগম করে। জিলহজ মাসে এই বন্ধন আরও মজবুত করা উচিত। এ কারণেই কোরবানির গোশতের একটি অংশ আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)

১৩. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা

পবিত্র এই দিনগুলোতে ইবাদতের সওয়াব যেমন বেশি, গুনাহের লিপ্ত হওয়াও তেমনি ভয়াবহ। পরকালীন মুক্তি ও জান্নাত লাভের প্রধান শর্ত হলো পাপাচার বর্জন করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ ছেড়ে দাও। যারা গুনাহ করে, শিগগিরই তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা আনআম: ১২০)

১৪. সৎ কাজের প্রতিযোগিতা করা

জিলহজের এই মহিমান্বিত দিনগুলোতে মুমিনদের উচিত কল্যাণকর কাজে একে অপরের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। এটি ইমানি শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম উপায়। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘সুতরাং তোমরা কল্যাণমূলক কাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা বাকারা: ১৪৮)। দান-সদকা, অসহায়কে সাহায্য এবং দ্বীনি কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা এই প্রতিযোগিতায় শামিল হতে পারি।

১৫. ঈদের নামাজ আদায় করা

১০ জিলহজ মুসলিম উম্মাহর জন্য আনন্দের দিন। এ দিন শুকরিয়াস্বরূপ দুই রাকাত ঈদুল আজহার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা ওয়াজিব। এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক। ওজর না থাকলে এই নামাজ খোলা ময়দানে বা ঈদগাহে আদায় করা সুন্নত।

ঈদের নামাজ আদায়ের নিয়ম

প্রথমে নিয়ত করে ইমামের সঙ্গে তাকবিরে তাহরিমা বেঁধে ছানা পড়তে হয়। এরপর ইমামের সঙ্গে অতিরিক্ত তিনটি তাকবির বলতে হয়; যার প্রথম দুই তাকবিরে হাত কান পর্যন্ত তুলে ছেড়ে দিতে হয় এবং তৃতীয় তাকবিরের পর হাত বাঁধতে হয়। এরপর ইমাম কিরাত পাঠ করবেন। দ্বিতীয় রাকাতেও যথারীতি কিরাত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত তিনটি তাকবির বলতে হয় এবং প্রতিবারই হাত কান পর্যন্ত তুলে ছেড়ে দিতে হয়। এরপর চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে যেতে হয়। বাকি নামাজ স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পন্ন করতে হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত