Ajker Patrika

ঋণ কমাতে গিয়ে আসামি, গ্রেপ্তার আতঙ্কে কৃষকের মৃত্যু

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
ঋণ কমাতে গিয়ে আসামি, গ্রেপ্তার আতঙ্কে কৃষকের মৃত্যু
নিহত কৃষক বিকাশ মিয়া। ছবি: সংগৃহীত

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে বিকাশ মিয়া (৪৯) নামের এক কৃষক মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা গেছেন। তাঁর পরিবার বলছে, বিকাশ মিয়া ঋণ করে হাওরে পাঁচ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। সম্প্রতি বন্যায় চার একরের ধান নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ঋণের চাপে পড়ে হাওরে মাছ ধরার জন্য তিনি আবারও কিছু টাকা ঋণ করে জাল কেনেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে বিকাশ মিয়া মাছ শিকার করতে পারেননি। এর মধ্যে তিনি একদিন মাছ শিকারে গেলে তাঁর জাল জব্দ করে মামলা দেয় পুলিশ। এরপর গ্রেপ্তার আতঙ্কে গত শুক্রবার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে মানসিক চাপে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান বিকাশ মিয়া।

আজ রোববার উপজেলার মাঘান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান বিকাশ মিয়ার স্ত্রী সনজিতা আক্তার। এ সময় বিকাশের বৃদ্ধ বাবা আহম্মেদ সাইরেলসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সনজিতা আক্তার জানান, তাঁর স্বামী গত শুক্রবার বিকেলে পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলায় আত্মীয়ের বাড়িতে পলাতক থাকা অবস্থায় স্ট্রোকে মারা যান। তিনি মোহনগঞ্জের মাঘান কুড়েরপাড় গ্রামের আহম্মেদ সাইরেলের ছেলে।

বিকাশ মিয়ার পরিবার জানায়, তিনি বোরো আবাদ ও পরে মাছ ধরার জন্য জাল কিনতে এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণ নেন। প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হতো প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। বর্ষা মৌসুমে হাওরে মাছ ধরে তা বিক্রির মাধ্যমে ঋণ শোধ ও সংসারের খরচ চালানোর পরিকল্পনা ছিল বিকাশের। কিন্তু স্থানীয়ভাবে হাওরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি মাছ ধরতে পারেননি।

এর মধ্যে ১১ জুলাই হাওরে মাছ ধরতে গেলে বিকাশ মিয়াসহ কয়েকজন জেলের ব্যবহার নিষিদ্ধ ‘খনা জাল’ জব্দ করে পুলিশ। পরে স্থানীয় জেলেরা থানা থেকে জব্দ করা জাল নিয়ে আসেন। এই ঘটনায় ১৩ জুলাই ৬৫ জনের নাম উল্লেখসহ আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ অজ্ঞাতনামা আসামির নামে মামলা করে পুলিশ। ওই মামলায় বিকাশের ভাতিজাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে পরদিন বিকাশ মিয়া ধর্মপাশায় তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাওরে মাছ শিকারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ২৮ জুন পর্যন্ত থাকলেও ডিঙাপোতা হাওরে মাছের পোনা অবমুক্ত করার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে উপজেলার কয়েক হাজার জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পেটের তাগিদে কেউ কেউ গোপনে মাছ ধরতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে পড়ছেন।

মো. ওসমান গণি নামের এক জেলে বলেন, ‘মামলার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে এলাকায় অনেক পুরুষ বাড়িতে নেই। সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় আমরা মাছ ধরিনি। এখন স্থানীয়ভাবে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।’

জানতে চাইলে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, ‘বিকাশ মিয়ার মৃত্যুর খবর আমার জানা নেই। মামলার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর ওই এলাকায় পুলিশ আর কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি।’

মোহনগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, গত ২৮ জুনের পর থেকে মাছ ধরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ও দেশীয় মাছের বিস্তার বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত