Ajker Patrika

জিয়া হত্যা /‘মঞ্জুর হত্যার বিচার হওয়া উচিত’

১৯৮১ সালের ৩০ মে, সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হন। বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনি তখন পর্যন্ত ছিল গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা। বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত জানা-অজানা বহু তথ্যের সমাবেশে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সাউথ এশিয়ান মনিটরের সম্পাদক ও অধুনালুপ্ত প্রোব নিউজের প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলী। ১৯৯৪ সালের ৩০ মে থেকে প্রতিবেদনটি আট পর্বে ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল মতিউর রহমান সম্পাদিত তৎকালীন দৈনিক ভোরের কাগজে। লেখকের অনুমতি নিয়ে আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি আবার প্রকাশ করা হলো। আজ চতুর্থ কিস্তি।

ইরতিজা নাসিম আলী
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১২: ০৭
‘মঞ্জুর হত্যার বিচার হওয়া উচিত’
জিয়াউর রহমানের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল। ছবি: সংগৃহীত

মেজর মোজাফফর চট্টগ্রামের সেনাবিদ্রোহের সময় খুব কাছ থেকে দেখেছেন সব ঘটনা। মেজর জেনারেল মঞ্জুর ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন। একাত্তরে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে যোগ দেন। রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করা হলে সেখান থেকে সেনাবাহিনীতে গৃহীত হন। পরবর্তীকালে মেজর পদে উন্নীত হন। জিয়া হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি মামলার একজন আসামি হলেন। কিন্তু তিনি বিদেশে চলে যেতে সক্ষম হন এবং বিদেশেই আছেন।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সেনাবিদ্রোহের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম না। তবে চিটাগাঙের অন্য সব সেনা অফিসার এবং সদস্যদের মতোই আমাকেও জড়িয়ে পড়তে হয়। আর সে কারণেই অনেক কিছু স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়ে যায়।’

অনেক দিন থেকেই সামরিক বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিতে শুরু করেছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা সংঘাতটিকেই অসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে সামরিক বাহিনীর ভেতর দলাদলি ছিল। শুধু তাই নয়, সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা অমুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসারদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল। সুবিধাবাদী অমুক্তিযোদ্ধারা একে কাজে লাগিয়ে তাঁদের হীন স্বার্থ হাসিল করে চলেছিল।

এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর ভেতরে অমুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযোদ্ধা পক্ষকে হতাশ করেছিল। এর একটা পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেন অনেকেই। প্রয়োজনবোধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনাও মুক্তিযোদ্ধা পক্ষের অনেকের মাথায় ঠাঁই পেতে শুরু করে।

অমুক্তিযোদ্ধা পক্ষও চুপ করে বসে ছিল না। তারাও মনেপ্রাণে চাচ্ছিল, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটুক। কৌশলে তারা মুক্তিযোদ্ধা পক্ষকে উসকানি দিতে শুরু করেছিল, যাতে মুক্তিযোদ্ধা পক্ষই অভ্যুত্থান ঘটায়। সম্ভবত সে কারণেই মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের বদলি করে নির্দিষ্ট সেনানিবাসগুলোতে সমবেত করতে অদৃশ্যভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। যাতে এক জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা থাকলে অভ্যুত্থান ঘটানোর সুবিধা হয় এবং অভ্যুত্থানের দায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযুক্ত করা যায়।

অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দুর্নীতি ধীরে ধীরে তুঙ্গে উঠছিল। দুর্নীতি চরম পর্যায়ে ওঠার শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধা পক্ষ অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দুর্নীতি ব্যাখ্যা করে একটা তালিকা পর্যন্ত প্রস্তুত করে। চরম দুর্নীতির কারণে জেনারেল এরশাদের নাম তালিকার শীর্ষে স্থান করে নেয়। অথচ এই তালিকার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তখনই এরশাদের দুর্নীতি ও অসৎ চরিত্রের কথা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল।

জিয়ার মৃত্যুর পর সেই এরশাদই বিএনপি সরকারকে দিয়ে বিচার করেছে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের। ফাঁসি দিয়েছে তাদের। বিএনপি সরকারের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সমস্ত কাজ করিয়ে নিয়ে যখন পথ পরিষ্কার হয়ে গেছে, ঠিক তখনই জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে বসেছেন নিরপরাধের মুখোশ পরে। এরশাদ সামরিক বাহিনীর ভেতরে কত যে ষড়যন্ত্র করেছে, তা তো পরে সবাই জেনেছে এবং প্রমাণও হয়ে গেছে। কিন্তু জিয়া জেনারেল এরশাদের ষড়যন্ত্রের কথাকে বিশ্বাস করেননি।

চট্টগ্রাম সেনাবিদ্রোহের দিন পনেরো আগে জেনারেল মঞ্জুর সামরিক বাহিনীর ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ এবং এর আশু প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াকে পনেরো পৃষ্ঠার একটা চিঠি লিখলেন। পৌঁছানোর জন্য তৎকালীন জিয়ার পিএস কর্নেল মাহফুজকে দিয়েছিলেন চিঠিটা। রাষ্ট্রপতি জিয়ার কাছে পৌঁছানোর আগেই ‘This is not your job’ বলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চিঠিটা হাতিয়ে নেন। এর পরবর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যায়, এই চিঠি আদৌ জিয়ার কাছে পৌঁছেনি। তাহলে হয়তো পরবর্তী ঘটনা এমন হতো না। শুধু তাই নয়, সেনাবিদ্রোহের তিন মাস পর কর্নেল মাহফুজকে অভ্যুত্থানের দায়ে জড়িয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। চিঠির বিষয়টি জানতেন বলেই মাহফুজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা।

অভ্যুত্থানের দায়ে অভিযুক্ত জেনারেল মঞ্জুরের বিচার না করে কেন তাঁকে হত্যা করা হলো—সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। আমার তো মনে হয়, একটু খেয়াল করলেই বোঝা সম্ভব, মঞ্জুরের হত্যার পেছনে কাদের হাত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কারা এতে লাভবান হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন এরশাদ এবং তাঁর সহযোগীরা। আমি মনে করি, মঞ্জুর হত্যার বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। বিচার হলে চক্রান্তকারীদের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাবে বলেই হয়তো এর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আগামীকাল: মঞ্জুর নিজের কাঁধ থেকে ব্যাজ খুলে ফেললেন, স্টার্ট নিল গাড়িটা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত