Ajker Patrika

বিসিএসের দীর্ঘ পথচলায় যেভাবে টিকে থাকবেন

আজগর আলী শামীম
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১২: ৩০
বিসিএসের দীর্ঘ পথচলায় যেভাবে টিকে থাকবেন
প্রতীকী। ছবি: মাহতাব হোসেন

জীবনের পথ কখনোই মসৃণ নয়। আসে ক্লান্তি, আসে অনিশ্চয়তা, আসে থেমে যাওয়ার প্রলোভন। কিন্তু যাঁরা সেই মুহূর্তগুলোতে নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারান না, শেষ পর্যন্ত সাফল্য তাঁদের হাতেই ধরা দেয়। আমার বিসিএস যাত্রার গল্পও তেমনই। আজ পেছনে তাকালে মনে পড়ে অসংখ্য নির্ঘুম রাত, টেবিলের সামনে কাটিয়ে দেওয়া দীর্ঘ সময়, ছোট ছোট ত্যাগের হিসাব। সেই পরিশ্রম আজ পূর্ণতা পেয়েছে। যাঁরা ভাবছেন, ‘এত বড় সিলেবাস কোথা থেকে শুরু করব?’ কিংবা ‘চাকরি সামলে বিসিএস সম্ভব?’—তাঁদের জন্য থাকছে অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ।

স্বপ্নের শুরু

আমি ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে পড়েছি। স্বাভাবিকভাবে করপোরেট জগৎ কিংবা ব্যাংকিং খাতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ ছিল। চাকরিও করেছি ব্যাংকে। তবু মনে হতো, আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। রাষ্ট্র ও মানুষের জন্য সরাসরি কিছু করার ইচ্ছাই আমাকে সিভিল সার্ভিসের পথে নিয়ে আসে। অনেকে মনে করেন, বিসিএসে সফল হতে হলে সারাক্ষণ বই নিয়েই থাকতে হয়। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে ভিন্নকথা। এখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, পরিকল্পনা আর সময়ের সঠিক ব্যবহার।

আমি ব্যাংকে পূর্ণকালীন চাকরি করেছি। দিনের কাজ শেষে শরীর ক্লান্ত থাকত। তারপরও প্রতিদিন পড়ার টেবিলে বসতাম। আমি জানতাম, এই কষ্ট ক্ষণিকের, কিন্তু অর্জন দীর্ঘদিনের।

প্রথম চেষ্টাতেই সাফল্য

বিসিএস দীর্ঘ পথের পরীক্ষা। এখানে মেধার পাশাপাশি ধৈর্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। তখনই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছিল—পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। ৪৭তম বিসিএসে প্রথম চেষ্টাতেই শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই বিশ্বাস যেন পূর্ণতা পায়।

যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি

বিসিএসের তিনটি ধাপ—প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা। প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা প্রস্তুতি প্রয়োজন। তবে একটি অভ্যাস শুরু থেকে ধরে রেখেছিলাম। সেটি হলো বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ। কোন বিষয় বেশি এসেছে, কোন টপিক বারবার ফিরে এসেছে—সেগুলো আগে বুঝে তারপর পড়তাম। এতে প্রস্তুতি অনেক গোছানো হয়েছে।

আজগর আলী শামীম
আজগর আলী শামীম

  • প্রিলিমিনারি: প্রিলির লক্ষ্য ছিল বেশি নম্বর নয়, নিশ্চিতভাবে উত্তীর্ণ হওয়া। তাই গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বিস্তারিত পড়েছি, অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সংক্ষেপে দেখেছি। নেগেটিভ মার্কিং মাথায় রেখে নিশ্চিত না হলে উত্তর দিইনি। প্রতিটি বিষয় শেষ করার পর অনলাইনে মডেল টেস্ট দিতাম। এতে নিজের দুর্বলতা সহজে ধরা পড়ত।
  • লিখিত: প্রিলির প্রস্তুতিই লিখিত পরীক্ষার প্রায় অর্ধেক পথ সহজ করে দেয়। লিখিত পরীক্ষায় শুধু তথ্য জানলেই হয় না, তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করাও জরুরি। আমি উত্তরপত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য, পরিসংখ্যান, চার্ট, মানচিত্র এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের উদ্ধৃতি ব্যবহারের চেষ্টা করতাম। এতে উত্তর আরও সমৃদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয়।
  • ভাইভা: ভাইভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি আত্মবিশ্বাসকে। নিজের বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার পাশাপাশি সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা এবং যে ক্যাডারের জন্য যাচ্ছি, সেই ক্যাডার সম্পর্কে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। শান্ত থাকা এবং স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলেছিলাম।

অনুজদের জন্য কয়েকটি কথা

এক. সব বিষয় সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়তে যাবেন না। বিগত প্রশ্ন বিশ্লেষণ করুন। যেসব টপিক বারবার এসেছে, সেগুলোতেই বেশি সময় দিন।

দুই. ধারাবাহিকতার বিকল্প নেই। এক দিন ১২ ঘণ্টা পড়ে কয়েক দিন বিরতি দেওয়ার চেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত কয়েক ঘণ্টা পড়া অনেক বেশি কার্যকর।

তিন. মৌলিক ভিত্তি শক্ত করুন। শুধু গাইড নয়, নবম-দশম শ্রেণির বোর্ড বইসহ মৌলিক বইগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

চার. ধৈর্য হারাবেন না। বিসিএস কোনো ছোট দৌড় নয়; এটি একটি ম্যারাথন। মাঝপথে ক্লান্তি আসবে, হতাশাও আসবে। অনেক সময় মনে হবে, অন্যরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আর আপনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। এই অনুভূতি স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোর তত কাছে আসে।

পরিশেষে একটি কথাই বলতে চাই। আপনি যত বড় দায়িত্বেই যান না কেন, দেশ ও মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা কখনো হারাবেন না। মনে রাখবেন, রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী হিসেবে ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বই বড়। জবাবদিহি, সততা ও মানবিকতা নিয়েই একজন প্রকৃত সিভিল সার্ভেন্টের পথচলা।

আজগর আলী শামীম, ৪৭তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত