Ajker Patrika

পাটগ্রামের চার যুবককে ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ হিসেবে রাশিয়ায় বিক্রি, অভিযোগ জামায়াতের দুই যুব নেতার বিরুদ্ধে

আজিনুর রহমান আজিম, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) 
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ২১: ৪৬
পাটগ্রামের চার যুবককে ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ হিসেবে রাশিয়ায় বিক্রি, অভিযোগ জামায়াতের দুই যুব নেতার বিরুদ্ধে
রাশিয়া যাওয়ার পরপরই ভুক্তভোগী চার যুবককে ট্রেনিংয়ে পাঠায় রুশ সেনাবাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের চার যুবককে উচ্চ বেতনে গার্মেন্টসে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী যুব সংগঠনের দুই নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ওই চার যুবকের পরিবার চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি ও সম্প্রতি (গত ২০ মে) উপজেলা জামায়াত কর্তৃক অব্যাহতি পাওয়া পাটগ্রাম উপজেলা যুব বিভাগের সভাপতি ইউনুস আলী ও পৌর যুব বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাহিন ইসলাম জনপ্রতি সাড়ে ৯ লাখ করে টাকা নিয়ে এই কাজ করেছেন।

রাশিয়ায় মানব পাচারের শিকার চার যুবক হলেন পাটগ্রাম সদর ইউনিয়নের টেপুরগাড়ী এলাকার কৃষক দেলদার রহমানের ছেলে নাজমুল হক সৌরভ (২১), একই এলাকার কৃষক রাবিউল ইসলামের ছেলে মেহেদী হাসান (২১), একই ইউনিয়নের সর্দারপাড়া এলাকার আফজাল হোসেনের ছেলে আল আমিন (২০) ও আব্দুল মজিদের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন (২২)।

পরিবারগুলোর দাবি, ঢাকা উত্তরার আরএস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮) এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়া পাঠানো হলে সেখানে নিরাপদ ও বৈধভাবে কাজের সুযোগ রয়েছে বলে পরিবারগুলোর কাছ থেকে টাকা নেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। পরে চলতি মে মাসের ৪ তারিখে এই চার যুবককে বাড়ি থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়ে বাহরাইন বিমানবন্দরে ১২ ঘণ্টা ট্রানজিট শেষে ৮ মে সকালে মস্কো পৌঁছান তাঁরা।

মস্কো বিমানবন্দরে নেমে যুবকদের সঙ্গে ভিডিওকলে স্বাভাবিক যোগাযোগ হলেও পরে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাসপোর্ট, ভিসা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তখনই যুবকেরা জানতে পারেন, চাকরির পরিবর্তে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অভিভাবকেরা জানান, পরে এক পণ্য সরবরাহকারীর (ডেলিভারি ম্যান) মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছেলেরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এবং বিভিন্ন সময়ে খুদে বার্তার (মেসেজ) মাধ্যমে নিজেদের জীবনঝুঁকির কথা জানিয়ে জীবন বাঁচানোর আকুতি জানান।

এ খবর পেয়ে পরিবারগুলো ইউনুস ও মাহিনকে জানালে তাঁরা প্রথমে ঘটনাটি অস্বীকার করেন। পরে ১৪ মে যুবকদের পরিবারের প্রতিনিধিদের নিয়ে ঢাকার আরএস ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির কার্যালয়ে যাওয়া হলে এজেন্সির লোকজন কয়েক দিনের সময় নিয়ে ছেলেদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সময় পার হওয়ার পর পরিবারগুলো এজেন্সির কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন, সেখানে তালা। গা ঢাকা দিয়েছেন এজেন্সির লোকেরা।

পরে ২১ মে ঢাকায় পাটগ্রামের ভুক্তভোগী পরিবারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে পাচার হওয়া ৩০টি পরিবারের সদস্যরা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন এবং সন্তানদের ফেরত আনতে আবেদন জানান।

নাজমুল হক সৌরভের বাবা দেলদার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেকে ইউনুস চক্রান্ত করে সাড়ে ৯ লাখ টাকা নিয়ে রাশিয়া নিয়ে গেছে। এখন শুনছি, সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা দিন-রাত দুশ্চিন্তায় আছি।’ মেহেদী হাসানের বাবা রাবিউল ইসলাম বলেন, ‘রাশিয়ায় আমার ছেলে ভালো থাকবে জানিয়ে ইউনুস টাকা নিয়ে পাঠায়। এখন আমার ছেলে নিখোঁজ।’

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আজ পাটগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানাকেও দায়ী করে পরিবারগুলো। এর আগে এ ঘটনার জেরে ২০ মে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী অভিযুক্ত ইউনুস ও মাহিনকে তাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা যুব বিভাগের অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি ইউনুস আলী বলেন, তাঁরা বৈধ কাগজপত্র নিয়েই গেছেন। তাঁরা ওইখানে প্রতারিত হয়েছেন। এজেন্সি ও দুই দেশের অ্যাম্বাসিতে নক দেওয়া হয়েছে, সবাইকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হবে। টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে ওরা যা টাকা দিয়েছে, সমস্ত টাকা মাহিনকে দিয়েছি। মাহিন এজেন্সিকে দিয়েছে।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অপর অব্যাহতি পাওয়া নেতা মাহিন ইসলাম বলেন, ‘পরিবারগুলোর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নাই। এজেন্সির সঙ্গে আমার মাধ্যমে ইউনুসের পরিচয় হলেও পুরো কাজ ইউনুস নিজে করেছেন। এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নাই।’

উপজেলা জামায়াতের আমির হাফেজ শোয়াইব আহমেদ বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করার প্রশ্নই আসে না। ব্যক্তির সঙ্গে সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। সংগঠন এ দায়ভার নেবে না। সংগঠন ঘটনা জানতে পেরে তাঁদের দুজনকে অব্যাহতি দিয়েছে।

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, ‘আমি এ ঘটনা শুনেছি। এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত