Ajker Patrika

হাটে নয়, ঘিওর থেকে সরাসরি রাজধানীর বাসায় কোরবানির গরু

আব্দুর রাজ্জাক, (ঘিওর) মানিকগঞ্জ
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ১০: ২১
হাটে নয়, ঘিওর থেকে সরাসরি রাজধানীর বাসায় কোরবানির গরু
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর ধানমন্ডির বাসায় কোরবানির গরু পৌঁছে দেওয়ার পর দাম পরিশোধ করলেন ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান। গ্রামের কৃষকের খামারে লালন-পালন করা গরুটির দাম ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সঙ্গে একটি খাসি কিনেছেন ২৫ হাজার টাকায়। হাটের ভিড়, পরিবহনের ঝামেলা কিংবা দালালের বাড়তি খরচ ছাড়াই সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পশু কিনে সন্তুষ্ট তিনি।

এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করছে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার একদল তরুণের গড়ে তোলা ‘প্রাকৃতিক কৃষি খামার’। ঘিওরের বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কাউটিয়া গ্রামের এই উদ্যোগ এখন শুধু গরু বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি হয়ে উঠেছে কৃষকের বিকল্প অর্থনৈতিক ভরসা।

২০২০ সালের বন্যার সময় এলাকার অনেক কৃষক ও খামারি যখন দিশেহারা হয়ে পড়েন, তখনই কয়েকজন তরুণ সিদ্ধান্ত নেন কৃষকের গরু সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার। সেই ভাবনা থেকে শুরু হয় প্রাকৃতিক কৃষি খামারের যাত্রা।

শুরুর বছরে মাত্র ১০টি গরু বিক্রি হলেও এখন দ্রুত বাড়ছে কার্যক্রম। চলতি বছর ইতিমধ্যে ২২টি গরু ও ৩৫টি খাসি বিক্রি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে আরও ১০ থেকে ১৫টি গরু সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা, কুমিল্লা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হোম ডেলিভারির মাধ্যমে কোরবানির পশু পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, এবার বিক্রি হওয়া কোরবানির পশুগুলোর মূল্য প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। উদ্যোক্তাদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগী বাদ পড়ায় কৃষকেরা তুলনামূলক বেশি দাম পাচ্ছেন, আবার ক্রেতারাও কম খরচে ভালো মানের পশু কিনতে পারছেন।

প্রাকৃতিক কৃষি খামারের পরিচালক দেলোয়ার জাহান বলেন, ‘গ্রামের কৃষকের কাছে গরু শুধু একটি পশু নয়, এটি তাঁর ব্যাংক। ফসল আবাদ করে আয়-ব্যয়ের হিসাব করলে কৃষকের হাতে তেমন কিছু থাকে না। কিন্তু এক বা দুটি গরু পালন করে বছর শেষে বিক্রি করলে সেটাই তাঁর সঞ্চয় হয়ে দাঁড়ায়। বিপদে পড়লে কৃষক গরু বিক্রি করেই আর্থিক সহায়তা পান।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু ব্যবসা করছি না। কৃষকের গরু ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ তৈরি করছি। এখন গ্রামের গরু সরাসরি ঢাকার বাসায় যাচ্ছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।’

এই কার্যক্রম পরিচালনায় ১২ সদস্যের একটি টিম কাজ করছে। কেউ পশু সংগ্রহ করেন, কেউ পরিবহন সমন্বয়, কেউ অনলাইনে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আবার কেউ ডেলিভারি ও পেমেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দলের কয়েকজন সদস্য ইতিমধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

হোম ডেলিভারি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সদস্য কৃষক কালাচাঁদ বলেন, ‘আগে আমরা আলাদাভাবে গরু পালন করতাম। এখন দলবদ্ধভাবে কাজ করছি। এতে খরচ কমেছে, বিক্রি বেড়েছে। আমাদের অনেক সদস্য এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছেন।’

ঘিওরের পেঁচারকান্দা গ্রামের কৃষক সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পায়ে ব্যথার কারণে আমি হাটে যেতে পারিনি। তখন প্রাকৃতিক কৃষি খামার আমার দুটি গরু ঢাকার সাভারে বিক্রি করে দেয়। আমি ঘরে বসেই ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছি। কোনো ঝামেলা হয়নি।’

ঢাকার ধানমন্ডির ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বলেন, ‘গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি গরু কিনে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগটি সত্যিই দারুণ। এতে ভালো মানের পশু সহজে পাওয়া যাচ্ছে, আবার কৃষকেরাও লাভবান হচ্ছেন।’

প্রাকৃতিক কৃষি খামারের সদস্য রাজু বলেন, ‘আগে কোনো নির্দিষ্ট আয় ছিল না। এখন এই কাজের মাধ্যমে নিজের আয় হচ্ছে, পরিবারও ভালো চলছে।’

ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, ডিজিটাল যোগাযোগ, সরাসরি বিপণন ও হোম ডেলিভারির সমন্বয়ে প্রাকৃতিক কৃষি খামার গ্রামীণ কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কোরবানির পশুর বাজারে এটি এখন একটি ব্যতিক্রমী ও আস্থার মডেল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত