Ajker Patrika

পরপর তিন ভূমিকম্প, আতঙ্কিত নরসিংদীবাসীর রাত কাটল খোলা আকাশের নিচে

হারুনূর রশিদ, নরসিংদী প্রতিনিধি
পরপর তিন ভূমিকম্প, আতঙ্কিত নরসিংদীবাসীর রাত কাটল খোলা আকাশের নিচে
ভূমিকম্প আতঙ্কের খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে বহু মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

পরপর তিনবার ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। সেখানে কিছু এলাকায় মাটিতে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পুরো জেলায় এখনো আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

গত শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত আতঙ্ক ও গুজবের মধ্যে ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন জেলার হাজারো মানুষ। রাস্তা, মাঠ, খোলা জায়গা যেখানে নিরাপদ মনে হয়েছে, সেখানেই কেটেছে রাত। নরসিংদী পৌর এলাকার ব্রাহ্মনদী, গাবতলী, পশ্চিম ব্রাহ্মনদী, মাধবদীর এসপি ও গার্লস স্কুল মাঠ, পলাশের পিডিবি ও প্রাণ-আরএফএল মাঠসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত মানুষকে বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। কেউ কলেজ মাঠে, কেউ বাড়ির আঙিনায়, আবার কেউ সড়কের ধারে রাত কাটিয়েছেন।

আজ সোমবার সকালেও মানুষের মাঝে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা গেছে। গতকাল রোববার দুপুরে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন আবারও আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ যেন গুজব না ছড়ায়, আর মানুষও যেন গুজবে বিশ্বাস না করেন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের বার্তার ওপর ভরসা রাখার অনুরোধ করেছেন তিনি।

তিনটি ভূমিকম্পের দুটিরই উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। গত শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রিখটার ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানীসহ আশপাশের এলাকা। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। পরদিন শনিবার সকালে আবার যে ভূমিকম্প হয়, তারও উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। শুক্রবারের ভূমিকম্পে নরসিংদী জেলায় ৫ জনের প্রাণহানি এবং শতাধিক আহত হন। বিভিন্ন স্থানে ও ভবনে ছোট-বড় ফাটল দেখা গেছে। শনিবার সকাল ৩ দশমিক ৩ মাত্রা এবং শনিবার সন্ধ্যায় ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সর্বশেষটি উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর বাড্ডা।

পরপর ভূমিকম্প, রাতভর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে ভয়ের মধ্যে দিন কাটছে নরসিংদীবাসীর। স্থানীয়রা বলেন, শনিবার সন্ধ্যার ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে রাত ১২টার পর বড় আকারের আরেকটি ভূমিকম্প হবে। মুহূর্তেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে শহর ও উপশহরে। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় ও খোলা জায়গায় বেরিয়ে পড়েন।

শনিবার দিবাগত রাতভর আতঙ্ক, খোলা আকাশের নিচে থেকেছেন বহু মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
শনিবার দিবাগত রাতভর আতঙ্ক, খোলা আকাশের নিচে থেকেছেন বহু মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

ব্রাহ্মনদীর বাসিন্দা রাশেদুল করিম বলেন, ‘ভবন কাঁপতে দেখে ছোট বাচ্চা নিয়ে বাইরে বের হই। গুজব শুনে আর ঘরে ঢুকতে সাহস হয়নি। রাতটা খোলা জায়গাতেই কাটিয়েছি।’

গাবতলীর মো. কবীর হোসেন বলেন, ‘এবারের ভূমিকম্পে গাবতলীতে বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়েছে। সেই ভয় মানুষকে মাঠে ঠেলে দিয়েছে। শনিবার রাতে আমাদের সবাই মাঠে থাকলেও আমি একাই বাড়িতে ছিলাম। অনেকেই রাত আড়াইটায়, কেউ ভোরে বাড়ি ফেরেন।’

খোলা মাঠে রাত কাটানো যুবক সুমন মিয়া বলেন, ‘শুনেছি পুরোনো ভবনগুলো ঝুঁকিতে। তাই পরিবার নিয়ে বাইরে থাকাই নিরাপদ মনে হয়েছে।’

পলাশের সাংবাদিক মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘রাত ১১টার পর ওয়াপদা গেট এলাকায় মানুষ কাঁথা-বালিশ নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। পলাশ বাজারেও একই দৃশ্য—অনেকে পিডিবির মাঠে রাত কাটান।’

শনিবার দিবাগত পুরোটাই জেগে ছিল নরসিংদীর মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
শনিবার দিবাগত পুরোটাই জেগে ছিল নরসিংদীর মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

মাধবদীর বাসিন্দা জাকির হোসেন রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে শিশুসন্তান নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, ‘কে জানে গুজব না গজব! কিছুই বোঝার মতো অবস্থা নেই।’

তাঁর সঙ্গে থাকা নীরব বলেন, ‘আটতলা ভবনে থাকি। টিনের ঘর নিরাপদ ভেবে খালার বাসায় যাচ্ছি।’

কলেজপাড়ার গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘পরপর তিনবার ভূমিকম্প! মনে হচ্ছিল বড় কিছু হয়ে যাবে। তাই নিচতলায় নেমে থাকি। বাচ্চারা আতঙ্কে কাঁদছিল।’

শনিবার সন্ধ্যার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কলেজপাড়া ও ব্রাহ্মনদী বালুরচরে ঘনবসতিতে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে আরও আতঙ্ক ছড়ানো হয়।

এ বিষয়ে সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আকরাম হোসেন বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো নোটিশ পাইনি। সিদ্ধান্ত হলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হবে।’

ভূমিকম্পের পরপরই জেলা প্রশাসন সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার শুরু করেছে। গুজবে কান না দিতে সকলকে অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গুজব ছড়াবেন না, গুজবে বিশ্বাস করবেন না। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও সহায়তা দেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত