Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর

বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও ভূমির অধিকার দাবিতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করলেন রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এলাকার ক্ষুদ্র নৃতাতিত্ত্বক জনগোষ্ঠী। ‘আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্ব সংরক্ষণে আদিবাসী সমাজের সৃজনশীল শক্তি প্রয়োগ করা’ প্রতিপাদ্যে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দাবিগুলো তুলে ধরলেন।

রাঙামাটিতে সকালে পৌরসভা প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে দিবসের উদ্বোধন, আলোচনা সভা, ৮ দফা দাবি উত্থাপন এবং বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটি’। সমাবেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে নতুন সরকারের কাছে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দাবি করা হয়।

সকাল ৯:৩০টায় বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট চঞ্চু চাকমা। তিনি বলেন, ‘আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সরকারের ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের লক্ষ্য এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও প্রথাগত জ্ঞান নিশ্চিত করা আবশ্যক।’ সরকার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জুম ইসথেটিকস কাউন্সিলের সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির চাকমা বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও যদি আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদাসীনতা দেখায়, তবে পাহাড়ে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে।’ তিনি আরও বলেন, আশির দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগতদের সেটেলার হিসেবে পুনর্বাসনের কারণে এখানকার জনমিতি পরিবর্তিত হয়ে আদিবাসীদের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে। উন্নয়নের নামে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ ও পর্যটনের প্রসারে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা আরও কোণঠাসা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টনে চুক্তির চেতনা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে রাঙামাটি গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি জয়তী চাকমা ইনু ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দীপেন দেওয়ানের হাতে হস্তান্তরের দাবি জানান।

রাঙামাটি জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জুয়েল দেওয়ান বলেন, রাষ্ট্রে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করে সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ শব্দের পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা, ভারতে মানবেতর জীবনযাপনকারী আদিবাসী শরণার্থীদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং ঐতিহ্যবাহী ধাত্রী ও প্রথাগত চিকিৎসকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান।

সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি থোয়াই অং মারমা পার্বত্য চট্টগ্রামকে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের ‘পানিশমেন্ট জোন’ বা শাস্তিমূলক বদলির স্থান হিসেবে ব্যবহারের প্রতিবাদ জানান।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষে ৮ দফা দাবি তুলে ধরেন ফোরামের সদস্য ইন্টুমনি তালুকদার। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন, আদিবাসীদের বিরুদ্ধে থাকা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষা ও চাকরিতে ৫ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা চালু।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিজ্ঞান্তর তালুকদারের সঞ্চালনায় এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম (পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল)-এর সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার (অব. উপসচিব) সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন অ্যাডভোকেট দীপন চাকমা ও আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য ফদাংতাং রান্দাল। তাঁরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অপচেষ্টার সমালোচনা করেন। আলোচনা সভা শেষে পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে শেষ হয়।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বান্দরবান:

বান্দরবানে আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির আয়োজনে রাজার মাঠ থেকে একটি র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজার মাঠে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি ডা. মং উষাথোয়াইয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএসমং। উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইচ প্রু মাস্টার, আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব উছোমং মারমাসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ। আয়োজনে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, খেয়াং, খুমীসহ ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ অংশ নেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের দাবি বাস্তবায়ন এবং আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

থানচিতে একই প্রতিপাদ্যে ৯ আগস্ট সকালে উপজেলা সদরের প্রবেশমুখে চৌরাস্তা মোড়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

উপজেলা আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান উবামং মারমার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক নারী ভাইস চেয়ারম্যান বকুলি মারমা। উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক থংএ খুমীর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান চসাথোয়াই মারমা, সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো, সমাজপতি নুমংপ্রু মারমা, পিসিপি সভাপতি সিংওয়াইমং মারমা, টিএসএফ সভাপতি আশাবান ত্রিপুরা, বিকেএসসি ধর্মবিষয়ক সম্পাদক চসিং খুমী এবং খিয়াং প্রতিনিধি উমায়া খিয়াং।

খাগড়াছড়ি:

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস: ২০২৬ উপলক্ষে এর লারমা স্কয়ারে নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে র‍্যালীর উদ্বোধন করা হয়। এরপর চেঙ্গী স্কয়ার এলাকা থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শুরু করে শাপলা চত্বর হয়ে শহরের মারমা উন্নয়ন সংসদে গিয়ে শেষ হয়। পরে আদিবাসী সাংস্কৃতিক মঞ্চের শিল্পীরা গান ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি ও অধিকারের দাবি জানান। পরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা পাহাড় ও সমতলে বসবাসকারী জাতি গোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান। সেইসঙ্গে অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন, ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা, পাহাড়ি নারী ও শিশুর অধিকার বাস্তবায়ন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধের দাবি জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রীতিময় চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সদস্য সুজন চাকমা ঝিমিট, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল সুমন, কেন্দ্রীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সাংগঠনিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা, লেখক ও গবেষক অনিম নওশাদ, বা. জ. স. সভাপতি মাহফুজুর রহমান শামীম, পানছড়ি উপজেলা পরিষদ-এর সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রত্না তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত