Ajker Patrika

চট্টগ্রাম বন্দর: ১৩ দিনে পাঁচ জাহাজের সংঘর্ষ, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

  • কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সব ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন।
  • বন্দরের মেরিন বিভাগ বলছে, গাইডের দূরদর্শিতা ও উপযুক্ত সমন্বয়ের অভাব।
আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম 
চট্টগ্রাম বন্দর: ১৩ দিনে পাঁচ জাহাজের সংঘর্ষ, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম বন্দরে দুই সপ্তাহের মধ্যে পাঁচ জাহাজের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও বিষয়টি আশঙ্কার বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে থেকে বলা হয়েছে, সাগর উত্তাল ও আউটার অ্যাংকরেজে জায়গা কম থাকায় জাহাজের সংঘর্ষ হচ্ছে।

বন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বন্দরের বহির্নোঙরে গত শুক্রবার পাশাপাশি নোঙর করে ছিল ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী ট্যাংকার এমটি সি স্পাইক ও গমবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি সান শাইন। সমুদ্র উত্তাল থাকায় সেদিন দুপুরে এমটি সি স্পাইকের সঙ্গে এমভি সান শাইনের সংঘর্ষ হয়। এতে সি স্পাইক জাহাজের ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশ করে ইঞ্জিন রুম প্লাবিত হয়। সেখানে জেনারেটর ও প্রধান ইঞ্জিন বন্ধ হলে পুরো জাহাজে ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। রাতেই জরুরি ব্যাটারি চালিয়ে জাহাজের যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা হয়। সূত্র জানিয়েছে, জোয়ার-ভাটায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয় এড়াতে দুর্ঘটনাস্থলে ফ্লোটিং অয়েল বুম স্থাপন করে জাহাজ ভাসিয়ে রাখা হয়। সব কার্গো ট্যাংক বন্ধ, সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়। তবে ইঞ্জিন রুম সম্পূর্ণ প্লাবিত হওয়া এবং পাওয়ার সিস্টেম বিকল হওয়ায় জাহাজটি এখন চলাচলের অনুপযোগী।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় জাহাজে থাকা ফিলিপাইনের ২৪ নাবিক অক্ষত আছেন। ডিজেলের ট্যাংকগুলো অক্ষত থাকায় সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়েনি। ফাটল দিয়ে জাহাজের তেলের ট্যাংকেও পানি ঢোকেনি। জাহাজে ৩৩ হাজার টন ডিজেল ছিল, যার পুরোটাই দাহ্য পদার্থ। জাহাজের ধাক্কায় আগুন লাগার আশঙ্কা ছিল। আগুন-তেল ছড়িয়ে আশপাশের জাহাজে আক্রান্ত হতো। ঘটনার পর দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর। কমিটি সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে।

এরপর গত শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বহির্নোঙরের আলফা অ্যাংকরেজে থাকা সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল স্ল্যাগবাহী জাহাজ এমভি আনাসসা প্রবল স্রোতের কারণে

পাশের এমভি জাহাব জাহানের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তবে দুটি জাহাজের নাবিকেরা নিরাপদে রয়েছেন। এদিকে, ৩ আগস্ট বেলা সোয়া ২টার দিকে মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ এমভি সিএনসি ইউরেনাস চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে পৌঁছালে এর স্টিয়ারিং গিয়ার বিকল হয়ে যায়। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজটি প্রথমে ২ নম্বর লাল সংকেত বয়ায় ধাক্কা দেয়। এরপর ভাসতে ভাসতে নৌবাহিনীর স্থাপনার পাশের পাথরের বাঁধে আটকে পড়ে। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, শনিবার দিবাগত রাতে এমভি আনাসসা প্রবল স্রোতের কারণে নোঙর করে রাখা এমভি জাহাব জাহান জাহাজের সামনের অংশে সামান্য স্পর্শ করে। তবে এতে কোনো হতাহত, পানি প্রবেশ বা পরিবেশদূষণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনার পরপরই উভয় জাহাজ নিরাপদে আলাদা হয়ে নোঙর করে এবং বর্তমানে নৌচলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং দুই জাহাজের ২১ জন ক্রুই নিরাপদ আছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচ জাহাজের সংঘর্ষের কথা স্বীকার করে রেফায়েত হামিম বলেন, প্রতিটি ঘটনা আলাদা। সে হিসেবে তদন্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ঘটনাগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়। প্রবল স্রোতের কারণেই হয়েছে।

নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘আমি দেখেছি, ৯০ শতাংশ জাহাজ দুর্ঘটনার কারণ হিউম্যান এরর। এটিও ব্যতিক্রম হবে না। কর্ণফুলীর মোহনা, সাগরের স্রোত কেমন আমরা সবাই জানি। হঠাৎ করেই স্রোত এসেছে; বিষয়টি এমন না। নেভিগেশনের মূল কথাই হলো তথ্য সংগ্রহ, অ্যাসেসমেন্ট, এরপর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন।’

জালাল উদ্দিন গাজী আরও বলেন, বন্দর মোহনা ও বহির্নোঙরের মতো ক্রিটিক্যাল স্থানে এগুলোর সমন্বয়ের জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। তা না হলে দুর্ঘটনা ঘটবে। ডিজাস্টার এড়াতে এখনই সতর্কতার প্রয়োজন। তবে ১৫ দিনে পাঁচটি জাহাজে সংঘর্ষের ঘটনা চিন্তার ব্যাপার। জাহাজের আধিক্য না প্রাকৃতিক বিপর্যয় তা বলা মুশকিল।

বন্দরের মেরিন বিভাগও বলছে, নেভিগেশনের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় গাইডের দূরদর্শিতা ও উপযুক্ত সমন্বয়ের অভাব ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া ও সামুদ্রিক প্রবল স্রোতের পূর্বাভাসের কথা জানা থাকা সত্ত্বেও নোঙররত জাহাজের খুব কাছাকাছি বিপজ্জনকভাবে অগ্রসর হওয়া এবং সময়মতো সঠিক নেভিগেশনাল সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তাই সে বে পাইলটের ভূমিকা পর্যালোচনার সুপারিশ এসেছে।

প্রাইড শিপিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আবদুল কাদির মেরিন একাডেমির ইনস্ট্রাক্টর। ফলে অভিজ্ঞতার ঘাটতির অভিযোগ সত্য নয়। এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।’

এদিকে, পৃথক তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ও নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর। দুর্ঘটনার কারণ, বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনার কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না এবং এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণে দুই সংস্থাই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, অধিদপ্তরও দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, বন্দরের কোনো স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হঠাৎ চট্টগ্রাম বন্দরে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচ জাহাজের সংঘর্ষের বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, এ সময়ে সাগর উত্তাল থাকে তা ছাড়া আমাদের আউটার অ্যাংকরেজে জায়গা কম থাকার কারণেই এক জাহাজের সঙ্গে অন্য জাহাজের সংঘর্ষ হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত