Ajker Patrika

নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প

ভুল সমীক্ষার মাশুল ১৮৩ কোটি

  • ‘অপর্যাপ্ত’ সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশায় ভুল।
  • ৪২১ কোটির প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ৬০৫ কোটি।
  • আট বছরেও কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগ।
  • বাস্তব কর্মপরিকল্পনার সুপারিশ আইএমইডির।
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
ভুল সমীক্ষার মাশুল ১৮৩ কোটি
দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়কের কাজ। অসম্পূর্ণ সড়ক যেন বাসিন্দাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগ। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের লালপুরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং নকশা প্রস্তুত না করেই হাতে নেওয়া হয়েছিল ‘নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’। শুরুতে ৪২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি পরে সংশোধন করে ৬০৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ওঠে। এতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ১৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশার ত্রুটির পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের ভুল হিসাবও এই ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আইএমইডির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘অপর্যাপ্ত’ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কারণে প্রকল্প শুরুর পর মাটি ও ভিত্তির নকশার বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ব্যয় বেড়েছে অনেক। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা ও নির্মাণকাজেও নানা ঘাটতি পাওয়া গেছে।

এদিকে সড়কের কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ থাকায় মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হয়েছে। লম্বা সময় ধরে নির্মাণকাজ চলায় ধুলাবালু ছড়িয়ে জনবসতির পরিবেশ ও ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে নবীনগর-আশুগঞ্জ অঞ্চলের সংযোগ উন্নত করার জন্য নেওয়া হয়েছিল ১৮ কিলোমিটার সড়কের এ প্রকল্পটি। সড়কটি নির্মিত হলে নবীনগর-আশুগঞ্জ অঞ্চলের অধিবাসীদের ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ ঘুরে কুমিল্লা হয়ে ঢাকা যেতে হবে না।

আইএমইডির প্রতিবেদনের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৪২১ কোটি ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় প্রথম সংশোধনীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৮৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধি শতাংশের হিসাবে ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।

অন্যদিকে, প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল তিন বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চার দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বাস্তবায়নকাল প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এপ্রিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৬৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। বাস্তব অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। বিশেষ করে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ।

প্রকল্পটি দ্রুত ও টেকসইভাবে শেষ করতে পরিবীক্ষণ দল একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।

এখনো দিন গোনা স্থানীয়দের

প্রকল্পটি শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। তাদের নৌপথ কিংবা ঘুরপথে ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে শহরে যাওয়ার কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হতো। সড়ক প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ায় সেই দুর্ভোগ কমছে না।

নবীনগর উপজেলার থোল্লাকান্দির কৃষক মো. জালাল মিয়া বলেন, ‘সড়কের কাজ ঠিকমত চলছে না। এলাকার মানুষকে বিকল্প হিসেবে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

নবীনগরের বাসিন্দা আইনজীবী মো. আবুল মিয়া বলেন, ভাঙাচোরা ও কাঁচা সড়কের কারণে বর্ষাকালে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাইকে। বলা হয়েছে, প্রকল্প শুরুর আগে মাটির গুণাগুণ ও ভিত্তি সম্পর্কে যথাযথ সমীক্ষা করা হয়নি। ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে মাটি ও ভিত্তির বিষয়ে নতুন করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে হয়েছে। পরে প্রকল্পের নকশা ও ড্রয়িংয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৭৩ হেক্টর থেকে বাড়িয়ে ৩৪ দশমিক ৯৬ হেক্টর করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে বেড়েছে ব্যয়ও। ভূমি অধিগ্রহণে প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৬০ কোটি ২২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। সংশোধনের পর তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পাদনে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিপালন বা অনুসরণে কিছু ঘাটতি ও জটিলতা ছিল। এ ধরনের ঘাটতি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও অর্থের যথাযথ ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

পরিদর্শক দল সরেজমিনে কাজের অগ্রগতি, পরিমাণ ও গুণগত মানে ব্যাপক ঘাটতি দেখতে পেয়েছে। স্থিতিস্থাপক ফুটপাত, আরসিসি ইউ ড্রেন এবং সসার ড্রেন নির্মাণে নির্ধারিত শর্ত ও বিল অব কোয়ান্টিটিজ (বিওকিউ) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য ল্যাবরেটরি টেস্টিং ব্যবস্থাতেও সীমাবদ্ধতা ও অবহেলা ছিল।

প্রকল্পের কাজের পাঁচটি প্রধান প্যাকেজ ছিল। এগুলোর মধ্যে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় অন্য কাজগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভাও নিয়মিত হয়নি। আগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও ঘাটতি ছিল। অর্থাৎ প্রকল্পের সমস্যা চিহ্নিত হলেও সেগুলোর সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যথেষ্ট ছিল না।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নির্মাণকাজ চলাকালে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ট্রাফিক সাইন ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতি ছিল। প্রকল্প শুরুর আগে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিকমের ইউটিলিটি লাইনের সঠিক ম্যাপিং করা হয়নি। ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে ইউটিলিটি স্থানান্তর নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং এতে সময় ও ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

প্রায় ৫৪ কোটি টাকার অডিট আপত্তি

৫৩ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ টাকা অডিট আপত্তি রয়েছে প্রকল্পটিতে। এর মধ্যে আছে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ না করে ৪৯ কোটি ৯ লাখ ৮১ হাজার ৪২৭ টাকার কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র সম্পাদন ও বাতিল করা। এ ছাড়া ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য দেওয়া অগ্রিম বিলের ভ্যাট ও আয়কর না কর্তন করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি ৩ কোটি ৭২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫১ টাকাসহ মোট ৪টি অডিট আপত্তি রয়েছে। এগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের মতামত

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নকশায় ত্রুটি রেখেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। পরে কিছু অর্থ খরচ করার পর বলা হচ্ছে, নকশা পরিবর্তন করতে হবে। এ ধরনের চিত্র শুধু এই প্রকল্পে নয়, এডিপির অনেক প্রকল্পে দেখা যায়। একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রকল্পের কারিগরি ও অর্থায়নের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। এরপর বাস্তবায়ন পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউনুস আলী সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশার ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘তিন বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে আট বছর লেগেছে। এখনো ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলে ঠিকাদারদের কাজ শেষ করতে তিন-চার মাস সময় লাগবে।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রকল্পের সমস্যাগুলো চিহিত করা হয়েছে, কাজও যাতে দ্রুত শেষ হয়, তা দেখা হচ্ছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেখবে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত