Ajker Patrika

ফাঁকা চেকে লাখ টাকার ঋণ, পীরগঞ্জে দাদন ব্যবসায়ীর ফাঁদে বহু পরিবার

পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি
ফাঁকা চেকে লাখ টাকার ঋণ, পীরগঞ্জে দাদন ব্যবসায়ীর ফাঁদে বহু পরিবার
দাদন ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান জিয়া। ছবি: সংগৃহীত

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় দাদন ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান জিয়ার সুদে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। বিপদের সময় সাময়িক স্বস্তির আশায় স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন রংপুরের পীরগঞ্জের কয়েকজন স্কুলশিক্ষক। অভিযোগ, ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের ফাঁকা চেক নেওয়া, চড়া সুদ আদায়, ঋণ পরিশোধের পরও চেক ফেরত না দেওয়া এবং সেই চেক ব্যবহার করে কয়েক গুণ বেশি টাকার মামলা করার কারণে বর্তমানে বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। শুধু শিক্ষক নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

উপজেলার চতরা ইউনিয়নের নাদনপাড়ার গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে। জিয়া চতরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এক সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দাদন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁর কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পর সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁরা আর্থিকভাবে আরও বিপর্যস্ত হয়েছেন।

চতরা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সতীশ চন্দ্র সংসারে আর্থিক সংকটের কারণে জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা ঋণ নেন। এর বিপরীতে ব্যাংকের একটি ফাঁকা চেক নেয়। তাঁদের দাবি, চার বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও ঋণের হিসাব শেষ হয়নি। সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় চতরা এলাকায় ২০ শতাংশ জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয় সতীশ চন্দ্রকে। প্রায় দুই বছর আগে সতীশ চন্দ্র মারা যান। এরপর তাঁর কাছে থাকা ফাঁকা চেক ব্যবহার করে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার মামলা করা হয় বলে দাবি পরিবারের। পরে স্থানীয়ভাবে আরও ২ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করতে হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বড় আলমপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহফুজার রহমান। তাঁর দাবি, তিনি বিপদের সময় জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নেন। পরে তাঁকে জিম্মি করে চতরা সোনালী ব্যাংক শাখা থেকে তাঁর অজান্তে ৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়। মাহফুজার রহমান বলেন, ঋণ নেওয়ার সময় ফাঁকা চেকসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই চেক ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে তাঁর ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।

একই বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেনের অভিযোগ, ২ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে সুদসহ প্রায় ৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। এরপরও তাঁর দেনা শেষ হয়নি। পরে তাঁর নামে সাড়ে ৭ লাখ টাকার চেক ডিজ-অনারের মামলা করা হয়। মকবুল হোসেনের দাবি, শুধু তাঁর বিরুদ্ধেই নয়, তাঁর ছেলে ও দুই ভাইয়ের নামেও মামলা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ লাখ টাকার মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওই ভুক্তভোগী পরিবারের।

এদিকে সরলিয়া টিএম ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক গোলাম রব্বানীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁর দাবি, সুদের টাকা দিতে না পারায় তাঁকে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে জিয়াউর রহমানের নিজ দোকানে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় তিনি মামলা করেছেন বলেও জানান। গোলাম রব্বানী বলেন সে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এর বিপরীতে ৪ লাখ টাকা সুদ দেওয়ার পরও তাঁর নামে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মামলা করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, পীরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ফাঁকা চেকের বিনিময়ে ঋণ দেন জিয়াউর রহমান। নির্ধারিত সময়ে সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে বাড়তে থাকে দেনার অঙ্ক। একপর্যায়ে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয় বলে তাঁরা অভিযোগ করেন। এভাবে ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষকের নামে বিভিন্ন অঙ্কের মামলা করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জোনাব আলী বলেন, বিপদের সময় নেওয়া ঋণই এখন বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের টাকা পরিশোধের পরও ফাঁকা চেক ফেরত না পাওয়ায় নতুন করে মামলা ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জিয়াউর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। চেক ও সুদের লেনদেন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তবে ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি তিনি। একপর্যায়ে ভিডিও ধারণের সময় ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন দেখে তিনি চড়াও হন।

অভিযোগের বিষয়ে পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজমূল হক বলেন, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ব্যক্তিগত ঋণ, চেক লেনদেন কিংবা মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও নথিপত্র পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত