Ajker Patrika

টিআর-কাবিখা-কাবিটা প্রকল্প: মিলেমিশে অর্ধেকের বেশি অর্থ লুটপাট

  • ২ লাখে মসজিদ পেল ৪০ হাজার টাকা।
  • কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ।
  • অস্তিত্বহীন প্রকল্পে সাড়ে ৫ টন গম।
  • তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস।
আনোয়ার হোসেন শামীম, গাইবান্ধা
টিআর-কাবিখা-কাবিটা প্রকল্প: মিলেমিশে অর্ধেকের বেশি অর্থ লুটপাট

গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই টাকার মধ্যে মসজিদ কমিটি পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ রকম বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পের সভাপতি মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্প সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি প্রকল্প কমিটির সভাপতি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এর বাইরে তাঁর কিছুই জানা নেই। এ-সংক্রান্ত প্রকল্পের বিষয়গুলো সারোয়ার ভাই দেখেন। চেকে স্বাক্ষর নিয়ে পরে তিনি আর মসজিদ কমিটি কী করেছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই।’

মসজিদ কমিটির সহসভাপতি জাহিদুল ইসলাম জানান, এই প্রকল্প সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। তাঁরা মসজিদের জন্য এ বছর সরকারি কোনো টাকা পাননি। একই কথা জানান কমিটির অন্য সদস্যরাও।

প্রকল্প পরিচালনাকারী সারোয়ার গিদারী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা সদস্য জরিফুল বেগমের স্বামী। তিনি বলেন, মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প ধরানো হয়েছে। বাকি টাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনাবেচা হয়। আমি এটি কিনে নিয়েছি।’

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ নিয়ে এমন অনেক অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পিআইও কার্যালয়ের কর্মকর্তা, প্রকল্প সভাপতি ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও অনুসন্ধান বলছে, কোনো প্রকল্পে শর্ত সাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে মোট বরাদ্দের পাঁচ ভাগের মাত্র এক ভাগ, কোনোটাতে দেওয়া হয়েছে বরাদ্দের অর্ধেক অর্থ। আবার কোনো প্রকল্পের নিজের ব্যক্তিগত লোকের নামে বরাদ্দ দিয়ে পুরো অর্থই আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে এবং নামে-বেনামে প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের হিরু মহুরীর বাড়ি থেকে পশ্চিমে মোস্তফার বাড়িগামী রাস্তা সংস্কারকাজে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৬ টাকা। বছর পার হলেও ওই রাস্তার কাজ এখনো শুরু হয়নি। ওই রাস্তা সংস্কারকাজের সভাপতি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সাফায়েতুল হক বলেন, ‘আমি নিজেই জানি না যে আমি ওই কাজের সভাপতি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই কাজের বরাদ্দ থেকে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার উত্তোলন করেছেন স্থানীয় এক সাংবাদিক।

এ ছাড়া পৌরসভার নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার কফিন ও ঘর নির্মাণ বাবদ ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর সভাপতি করা হয়েছে জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আমিনুল ইসলাম ফকুকে। তিনি টাকা তোলার বিষয়ে কিছুই জানেন না। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, রেলের জমি দখল করে নিজের বাড়ির সামনে নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার অফিস ঘর তৈরির করছেন যুবলীগ নেতা কায়ছার প্লাবন। তিনি টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা হারুন মিয়া বলেন, ‘উত্তরপাড়ার এই কবরস্থান অনেক পুরোনো। বরাদ্দটা পাওয়া গেলে প্রাচীর করা যেত।’

একই অর্থবছরের কাবিখা তৃতীয় পর্যায়ে আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি থেকে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে প্রায় সাড়ে ৫ টন গম বরাদ্দ হয়। বাস্তবে প্রকল্পটির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটিকে রাস্তা বলা হলেও সেটি মূলত কয়েকটি পরিবারের বাড়ির উঠান। স্থানীয় আব্দুস সালাম বলেন, ‘এখানে কোনো রাস্তা নেই, এটা বাড়ির উঠান। এখানে কোনো কাজ করা হয়নি।’

প্রকল্প সভাপতি সাইফুল ইসলাম মোবাইল ফোনে কথা বলার শুরুতে ইটের কাজ করার দাবি করলেও এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন আগের কথা, দেখতে হবে কোন প্রকল্প।’

২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর প্রকল্পের আওতায় বাদিয়াখালী ইউনিয়নে ‘৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছাট চকবরুল শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দিরের উন্নয়ন’ প্রকল্পে ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু মন্দির পরিচালনা কমিটি টাকা পেয়েছে মাত্র ২৬ হাজার। বাকি অর্ধেক টাকা আত্মসাৎ করেছে পিআইও অফিসসংশ্লিষ্টরা। মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘আমাদের প্রথম দফায় ২৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় বাকি টাকার জন্য পিআইও অফিসে গেলে জানানো হয়, ওই টাকা নেই।’ একই বক্তব্য প্রকল্পের সভাপতি নিকুঞ্জ কুমার শীলের।

একই অর্থবছরে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ‘বালাআটা উত্তরপাড়া জামে মসজিদ উন্নয়ন’ টিআর প্রকল্পে ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মসজিদ কমিটি পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা।

উত্তরপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি জাকিরুল বলেন, ‘ইউপি সদস্য ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন।’ ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা পিআইও স্যারের।’ তিনি বলেন, ‘পিআইও সাহেব আমাকে অর্ধেকের শর্ত দিয়েই প্রকল্পটি দিয়েছেন।’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও এমন হিসাব কেন, এমন প্রশ্নে মোস্তফা জানান, পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প দেবেন না। এ সময় আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে দিয়েছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা। বর্তমান পিআইও (রিয়াজুল) সাহেব মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও খান।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব প্রকল্পে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিয়ে গেছে, তাদের কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। পিআইও অফিস সম্পর্কে মনে হয় আপনি নতুন করে জানেন। এখানে সবাই হাত দেয়। আমার পক্ষে অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব কি?’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি অর্থ লুটপাট-আত্মসাতের সুযোগ নেই। তদন্ত চলছে, প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত