Ajker Patrika

বাগেরহাটের ফকিরহাট: তীব্র রেণু-সংকটে চিংড়িচাষিরা

  • ঘেরে রেণু ছাড়ার মৌসুম শেষ হতে চললেও চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ মিলেছে
  • প্রাকৃতিক জলাশয়ের রেণু আহরণে নিষেধাজ্ঞা এবং হ্যাচারি কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি
  • ঘের প্রস্তুত করে দ্বিগুণ দাম দিয়েও রেণু না পাওয়ায় ক্ষতির শঙ্কায় চাষিরা
আবুল আহসান টিটু, ফকিরহাট (বাগেরহাট) 
বাগেরহাটের ফকিরহাট: তীব্র রেণু-সংকটে চিংড়িচাষিরা
বাগেরহাটের ফকিরহাটের রেণু মার্কেট। সরবরাহ না থাকায় ক্রেতাশূন্য পড়ে আছে একসময়ের জমজমাট এই মার্কেট। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় চিংড়ি চাষের মৌসুমে রেণুর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এপ্রিল, মে ও জুন–এই তিন মাস ঘেরে রেণু ছাড়ার মৌসুম। কিন্তু এরই মধ্যে আড়াই মাস পার হতে চললেও চাষিরা চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেণু সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে অধিকাংশ ঘেরেই এবার চিংড়ি চাষ বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

চিংড়িচাষি, রেণুর আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নানা সংকটে হ্যাচারিতে সীমিত উৎপাদনের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব উৎপাদন, বাজার, কর্মসংস্থান ও উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকায় পড়ছে।

ফকিরহাটের জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ৮ হাজার ৪টি ঘের ও ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব ঘের ও পুকুরে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদার রেণুর চাহিদা রয়েছে। তবে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বাস্তবে ঘেরের সংখ্যা ও উৎপাদনকাঠামো বিবেচনায় এই চাহিদা মৎস্য বিভাগের দেওয়া ১১ কোটি ৭২ লাখ পোনার প্রায় ৪ গুণ বেশি। তাঁরা জানান, চলতি মৌসুমে ফকিরহাটে রেণুর চাহিদা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি।

উপজেলা মৎস্যচাষি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ফলতিতা বাজারে ৫ শতাধিক মাছের আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। বছরের প্রায় ১০ মাস চলে এই বেচাকেনা। এ বাজারে শ্রমিক ও পরিবহনব্যবস্থা ঘিরে ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া মৎস্যচাষি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার প্রায় ২০ হাজার বাণিজ্যিক ঘের ও পুকুরে মাছ চাষের সঙ্গে আরও লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

গত বৃহস্পতিবার উপজেলার নলধা, ঠিকরিপাড়া ও মূলঘর এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘের প্রস্তুত করে অনেক চাষি ২ থেকে ৩ মাস অপেক্ষা করছেন। মৌসুম প্রায় শেষ হলেও রেণু মিলছে না।

ঠিকরিপাড়া এলাকার চিংড়িচাষি দাউদ হায়দার বাবু ফকির জানান, তাঁর এক একর ঘের প্রস্তুত করতে অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিবছর এই ঘেরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়তেন। তবে এবার মৌসুম শেষের দিকে এসেও মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করে মাছ ছাড়তে না পারায় এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

রেণুর আড়তদার শেখ মনি জানান, বাজারে রেণুর দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে তাঁর অগ্রিম দেওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকার দাদন এখনো আটকে আছে। মৌসুম প্রায় শেষ, তবু রেণু মিলছে না।

ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়তমালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত রেণু উৎপাদন না হওয়ায় বাধ্য হয়ে চিংড়ি চাষের জন্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার নদী ও সমুদ্র থেকে আহরিত প্রাকৃতিক রেণু এবং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা বাগদা ও রেণু পোনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

উপজেলা মৎস্য বিভাগ থেকে জানা গেছে, ফকিরহাটে গত অর্থবছরে মোট ২ হাজার ৩১৫ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিংড়ি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টন।

বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, ২০১১-১২ সালে দক্ষিণাঞ্চলে ৭৮টি হ্যাচারি ছিল। মান নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ২০২৫-২৬ সালে তা ৩৭টিতে নেমে এসেছে।

ফকিরহাটের জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু আহরণ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় অভিযান চালানো হচ্ছে। হ্যাচারির রেণু চাষ বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্র ৮ শতাংশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত