Ajker Patrika

ধ্বংসের মুখে ঐতিহাসিক রায়পুর জমিদারবাড়ি, অযত্নে নষ্ট হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

মিফতাহুল ইসলাম, পীরগঞ্জ (রংপুর)
ধ্বংসের মুখে ঐতিহাসিক রায়পুর জমিদারবাড়ি, অযত্নে নষ্ট হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
ছবি: সংগৃহীত

এক সময় জমিদারের এজলাসে বসত বিচার, মন্দিরে বাজত শঙ্খ, আর নদীর ঘাটে ছিল মানুষের আনাগোনা। ছিল অতিথিশালা, পুকুর, সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ ও কারুকার্যখচিত ভবন। সময়ের পরিক্রমায় সেই জমিদারবাড়ির এখন করুণ দশা। আগাছা আর ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে প্রাসাদ চত্বর, ভেঙে পড়ছে পুরোনো ভবন, পরিত্যক্ত মন্দিরে ঢোকারও উপায় নেই।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে ছোট আখিরা নদীর তীরে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রায়পুরের জমিদার লাসমন সিংয়ের তিন ছেলে মুরালী সিং, বদি সিং ও বীরেন সিং। বাবার মৃত্যুর পর তাঁরা পৈতৃক সূত্রে জমিদারির দায়িত্ব পান। দেশভাগের আগে মুরালী সিং ও বদি সিং ভারতে চলে যান। পরে ১৯৪৭ সালে বীরেন সিংও ভারতে চলে যান। লাসমন সিংয়ের প্রায় ১৯শ বিঘা জমি পীরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিল। বীরেন সিংয়ের কোনো সন্তান ছিল না। বীরেন সিং ভারতে চলে যাওয়ার পর জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের হাতে সম্পত্তির দেখভালের দায়িত্ব ছিল। পরে তাঁদের কেউ কেউ বিভিন্ন কাগজপত্রের মাধ্যমে এসব সম্পত্তির মালিকানা দাবি করেন। এর ফলে জমিদার পরিবারের বিপুল সম্পত্তি ধীরে ধীরে বেহাত হয়ে যায় বলে দাবি স্থানীয়দের।

রায়পুর জমিদারবাড়ি এক সময় প্রায় ১৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। দেশ স্বাধীনের পর জমিদারবাড়ির জমিও দখলের প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পরে রায়পুর উচ্চবিদ্যালয় জমিদারবাড়িসহ প্রায় পাঁচ একর জমি পায়। অবশিষ্ট জমির বড় একটি অংশও বেদখল হয়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।

আখিরা নদীর তীরের উঁচু ভিটায় প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে ছিল জমিদার বীরেন বাবুর মূল প্রাসাদ। চারপাশে ছিল ইট সুরকির প্রাচীর ও সারিবদ্ধ নারিকেলগাছ। পাশে ছিল দুটি বড় পুকুর। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ছিল জমিদারের বিচারালয়। বিচারকক্ষ থেকে ইট বিছানো একটি ঘাট নেমে গেছে আখিরা নদীর দিকে। জমিদারবাড়ির পশ্চিম পাশে থাকা অতিথিশালাটি কয়েক বছর আগেও রায়পুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় এখন সেখানে শিক্ষার্থীরা থাকেন না।

উত্তর কোণের বসার ও শোয়ার ঘরও ভেঙে ইট সুরকির স্তূপে পরিণত হয়েছে। বসার ঘরের একটি অংশ স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পূজামণ্ডপ হিসেবে ব্যবহার করতেন। বর্তমানে সেটিও পরিত্যক্ত।

জমিদারবাড়ির নির্মাণশৈলী ছিল নান্দনিক ও কারুকার্যখচিত। দরজা জানালাসহ বিভিন্ন স্থাপত্য উপকরণ ছিল দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন ও সংরক্ষণের অভাবে এসবের অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রানা মিয়া বলেন, এখনো এখান থেকে ইট-পাথরসহ পুরোনো নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখনো চুরি যাচ্ছে ইট-পাথর। আবার রাতের আঁধারে মাদকের রমরমা ব্যবসা চলে।

আরেক বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, জমিদারবাড়ির অবশিষ্ট স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দ্রুত সংরক্ষণ করা দরকার। একই সঙ্গে জমিদার পরিবারের বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তির বিষয়েও সরকারি উদ্যোগে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান দুলাল চৌধুরী বলেন, স্থাপনাটি সংরক্ষণ করে পর্যটনকেন্দ্র, বিনোদনকেন্দ্র বা পিকনিক স্পট গড়ে তোলা সম্ভব।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকীউল বারী বলেন, বিষয়টি আমি গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত