Ajker Patrika

ফরিদপুর মেডিকেলে বাক্সবন্দী ২৩ কোটি টাকার যন্ত্র, অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াও গায়েব

ফরিদপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৩: ২২
ফরিদপুর মেডিকেলে বাক্সবন্দী ২৩ কোটি টাকার যন্ত্র, অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াও গায়েব
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযানে দুদক। ছবি: আজকের পত্রিকা

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি চিকিৎসাযন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে ক্যাথল্যাব স্থাপনের নয় বছর পরও চালু হয়নি আর লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর রয়েছে বাক্সবন্দী। এ ছাড়া চিকিৎসাসামগ্রী (এমএসআর) কেনায় অনিয়ম ও সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া জমা না হওয়ার তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আজ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালটিতে দুই দিনের অভিযান শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান দুদকের ফরিদপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজ। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এই অভিযান আজ রাত ৮টায় শেষ হয়। সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজের নেতৃত্বে দুদকের আট সদস্যের একটি দল এতে অংশ নেয়।

দুদক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে রোগীদের হয়রানি, দালাল চক্রের মাধ্যমে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটের জন্য প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর কেনা হয়। তবে যন্ত্রটি এখনো বাক্সবন্দী অবস্থায় রয়েছে। একই অর্থবছরে কার্ডিওলজি বিভাগের জন্য ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয়। কিন্তু যন্ত্রটি আজও চালু করা হয়নি। দুদকের অভিযোগ, যন্ত্র দুটি চালু না করেই সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজ বলেন, অবকাঠামো নির্মাণ না করেই লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর মেশিনটি কেনা হয়েছে। আর ক্যাথল্যাব চালু না করায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সব নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালের এমএসআর বা চিকিৎসাসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও তথ্যের গরমিল পেয়েছে দুদক। অভিযানে ফেব্রিকস নামের একটি ওষুধের ৭৬২ বোতল ঘাটতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে হেক্সাটন নামের একটি ওষুধের বোতল বেশি পাওয়া গেছে। দুদক কর্মকর্তা বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে সিটিস্ক্যান ও এক্স-রে পরীক্ষা বন্ধ থাকার বিষয়েও অনুসন্ধান করেছে দুদক। কর্মকর্তা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এমএসআর কেনার কার্যাদেশে সিটিস্ক্যান ও এক্স-রে ফিল্মসহ বিভিন্ন সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব ফিল্ম সরবরাহ করেনি। তা সত্ত্বেও অন্য সামগ্রীর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া আদায় ও জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে দুদক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক মাসে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাবদ কোনো অর্থ জমা হয়নি। হাসপাতালটিতে পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, যার মধ্যে দুটি নষ্ট। অন্য তিনটি চালু থাকলেও সেগুলোর ভাড়ার টাকা সরকারি হিসাবে জমা পড়েনি বলে জানিয়েছে দুদক। এ ঘটনায় অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগের নথিপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রতিটি রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছি। এসব নথি বিশ্লেষণ করে দায় নির্ধারণ করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধান কমিশনার বরাবর পাঠানো হবে।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দুদক আমাদের কাছে যা যা চেয়েছে, সব তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছি। হাসপাতালের ওই দুটি যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে।’

অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার অর্থ জমা না হওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু। তবে এমএসআর কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলে জানান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত