বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাদের শ্রম শুধু দেশের রপ্তানি খাত গড়ে তোলেনি, তৈরি করেছে করভিত্তিও। এই শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশির জোগান দেয় এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১ শতাংশ। শ্রমিকদের পরিশোধিত কর এবং তাদের টিকিয়ে রাখা বিস্তৃত অর্থনীতি মিলেই বাংলাদেশের সরকারি স্কুল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উল্লেখযোগ্য অংশের অর্থ জোগায়।
কয়েক দশক ধরে এই শিল্প একসময় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে থাকা একটি দেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছে। দেশটি এখন জাতিসংঘের ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ বা এলডিসি শ্রেণি থেকে বেরিয়ে আসার মানদণ্ড পূরণের চেষ্টা করছে। আধুনিক উন্নয়ন মডেলটি কাজ করেছে। প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে অন্য কোনো দেশ কি এই পথের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে?
এই মডেলটি একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশগুলো সস্তা শ্রমের প্রস্তাব দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করে। কর্মসংস্থান তৈরি করে পারিবারিক আয়। আয় তৈরি করে করভিত্তি। সেই করভিত্তি থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে সরকারি বিনিয়োগ হয়, যা ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে উচ্চ মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম করে।
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং চীন এই পথের কোনো না কোনো সংস্করণ অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশও তাই করেছে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণিত পথ, এবং এত বড় পরিসরে অন্য কোনো মডেল কাজ করেনি।
এআই এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি তৈরি করছে। সরাসরি পোশাকশ্রমিকদের রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করে নয়, বরং যে কারণে কারখানাগুলো প্রথমে স্বল্প মজুরির দেশে গিয়েছিল সেই কারণটিই সরিয়ে দিয়ে। এআই-চালিত কাটিং মেশিন এবং রোবোটিক সেলাই ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি যত সস্তা হচ্ছে, ঢাকার একজন শ্রমিক এবং গুয়াংডংয়ের একটি যন্ত্রের মধ্যে খরচের পার্থক্য তত কমছে।
একসময় এই যুক্তিই উল্টে যায়। তখন কাঁচামাল স্বল্প মজুরির দেশে পাঠিয়ে আবার প্রস্তুত পণ্য ফেরত আনার বদলে ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন স্বয়ংক্রিয় করা বেশি যুক্তিসংগত হয়ে ওঠে। যখন তা ঘটে, তখন কারখানাগুলো শুধু শ্রমিক ছাঁটাইই করে না, নতুন করে আর নেয়ও না। আর কোনো সরকার এমন একটি কারখানার ওপর কর আরোপ করতে পারে না, যা কখনোই তার ভূখণ্ডে গড়ে ওঠেনি।
এটাই এআইকে আগের স্বয়ংক্রিয়তা উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে। হুমকি শুধু বিদ্যমান কারখানার চাকরির জন্য নয়, যদিও সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গভীরতর হুমকি হলো পুরো উন্নয়ন মডেলের জন্য। বিংশ শতকে কার্যকর এই ধারাবাহিকতা শুধু কর রাজস্বই দেয়নি। ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করেছে পারিবারিক আয়, অভ্যন্তরীণ ভোগ, দক্ষতা সঞ্চয় এবং সময়ের সঙ্গে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
তাত্ত্বিকভাবে, খুব বেশি মানুষকে নিয়োগ না দিয়েও কোনো দেশ পণ্যের ওপর কর আদায় করতে পারে। কিন্তু সেটি উন্নয়ন নয়। সেটি একটি সম্পদনির্ভর অর্থনীতি, আর এমন অর্থনীতির রাজনৈতিক অস্থিরতা সুপ্রতিষ্ঠিত। কর্মসংস্থান থেকে পুনর্বণ্টনের যে শৃঙ্খল, সেটি শুধু আর্থিক প্রক্রিয়া নয়; স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের সামাজিক ভিত্তি।
এআই ও কর্মসংস্থান নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় একটি ‘প্রধান চরিত্র’গত সমস্যা আছে। এখানে মূল চরিত্র সফটওয়্যার প্রকৌশলী, প্যারালিগ্যাল এবং আর্থিক বিশ্লেষকেরা। তাদের প্ল্যাটফর্ম আছে, নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ আছে, তাই তারা চাকরি হারানোর মুখে পড়লে তা নীতিগত সংকটে পরিণত হয়। কিন্তু একই কাঠামোগত শক্তি যখন উন্নয়নশীল বিশ্বের কারখানার মেঝে দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন সেটি আদৌ কোনো এআই গল্প হিসেবেই ধরা পড়ে না।
অনেক উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্নিহিত যুক্তিও এই বোঝাপড়াকেই শক্তিশালী করে। ধারণাটি হলো—এআই হোয়াইট-কলার জ্ঞানভিত্তিক কাজকে ব্যাহত করে, আর তারা এখনো উৎপাদন খাতে আছে, তাই তাদের সময় আছে। এই যুক্তি বুঝতে চায় না যে, চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয়তা কত দ্রুত একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষয় করতে পারে।
এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা মূলত যেসব দেশ সবচেয়ে উন্নত মডেল তৈরি ও ব্যবহার করে তাদের হাতে গঠিত। সেখানে অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, ভুয়া তথ্য এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এগুলো বাস্তব ঝুঁকি, কিন্তু এগুলো এমন সমাজের ঝুঁকি যাদের ইতিমধ্যে পরিণত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বহুমুখী করভিত্তি রয়েছে। আলোচনার পরিসর কিছুটা বিস্তৃত হচ্ছে। এ বছর ভারতের এআই সম্মেলনে ‘প্রভাব’ বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে ছিল, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
তবু সবচেয়ে বিস্তৃত আলোচনাতেও গুরুত্ব থাকে প্রযুক্তি গ্রহণ ও প্রবেশাধিকারের ওপর, শ্রমনির্ভর অর্থনীতির কর ভিত্তির ওপর কাঠামোগত হুমকির ওপর নয়। এআই শাসনকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখাও বাস্তব চিত্রকে বিকৃত করে।
শত কোটি উৎপাদন শ্রমিক এবং এখনো নির্মাণাধীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চীনও বহু উন্নয়নশীল দেশের মতো একই পুনর্বণ্টন ঝুঁকির মুখে। প্রকৃত বিভাজন প্রযুক্তি নেতৃস্থানীয় ও অনুসারী দেশের মধ্যে নয়, বরং সেই দেশগুলোর মধ্যে যাদের পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা আসন্ন ধাক্কা সামলাতে পারবে এবং যাদের পারবে না।
আর্থিক দিকটিও এই সমস্যাকে জোরদার করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সহজে হারানো শ্রম করের বদলে প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর কর আরোপ করে সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। এসব কোম্পানি সাধারণত বিদেশি এবং তাদের মুনাফা অন্যত্র দেখানো হয়। মুনাফা স্থানান্তর ঠেকাতে ওইসিডির বৈশ্বিক ন্যূনতম কর সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু এমন একটি কোম্পানির ক্ষেত্রে এর কোনো সমাধান নেই, যা কয়েক ডজন কর্মী দিয়ে বিলিয়ন ডলার আয় করে, অথচ তার পণ্য এমন দেশগুলোতে হাজার হাজার চাকরি বিলুপ্ত করে যেখানে সেই মুনাফার কোনো অংশই পৌঁছায় না।
তাহলে কী করা যেতে পারে? উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এআই-চালিত শ্রম স্থানচ্যুতির আর্থিক প্রভাবকে বৈশ্বিক আলোচ্যসূচিতে তোলার জন্য চাপ দিতে হবে। তাদের উচিত জি-২০-এ একটি বিশেষ কর্মদল গঠনের দাবি জানানো, যা এআইয়ের সম্ভাবনা নয়, বরং শ্রমনির্ভর অর্থনীতির কর ভিত্তির ওপর এর কাঠামোগত প্রভাব নিয়ে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক কর কাঠামো হালনাগাদ করা জরুরি। এবং পরবর্তী বড় এআই সম্মেলনে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে দাবি তুলতে হবে, যাতে আলোচনায় সেই পুনর্বণ্টন কাঠামোর ওপর পদ্ধতিগত ঝুঁকির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়, যার ওপর সামাজিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।
বাংলাদেশ সফল হয়েছে। কিন্তু যেসব দেশ এখনো অপেক্ষায় আছে, তাদের জন্য প্রশ্নটি আর এই নয় যে এআই শেষ পর্যন্ত তাদের কারখানায় পৌঁছাবে কি না, বরং কেউ আদৌ সেই কারখানাগুলো নির্মাণ করবে কি না।
তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত ১৯০ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়ামের এক-তৃতীয়াংশই (৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার) সরবরাহ করে কাতার। গত ২ মার্চ কাতারের রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পাঞ্চলে ইরানি হামলার পর কাতারএনার্জি তাদের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে।
১ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরুর প্রায় চার সপ্তাহ পার হতে চলেছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে। যদিও ইরান বলছে, এমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সেনা জড়ো করছে।
৬ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে ‘গঠনমূলক’ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে এটিকে তেলের দাম কমানো এবং বিশ্লেষকেরা এটিকে ‘সময়ক্ষেপণের’ উদ্দেশ্যে ছড়ানো ভুয়া খবর বলে অভিহিত করেছেন।
৮ ঘণ্টা আগে
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত রুশ বিমানশক্তি, গোয়েন্দা ও যুদ্ধকৌশল এখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাজে লাগছে। এর ফলে ৬ বছরে পড়া গৃহযুদ্ধে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারছে। মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব চীনের। চীন–মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে থাকা শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপরও...
১ দিন আগে