
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে গত এক দশকে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। একসময় যা ছিল কেবল বিশেষ সুবিধা, আজ তা পরিণত হয়েছে দলমত-নির্বিশেষে এক ‘অঘোষিত রাজনৈতিক চুক্তিতে’। নগদ অর্থসহায়তা, ভর্তুকি এবং নারীকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলো এখন ভারতীয় রাজনীতির ‘ডিফল্ট গ্রামার’ বা সাধারণ ব্যাকরণ। তবে সাম্প্রতিক তথ্য ও নির্বাচনী ফলাফল এক ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে—জনকল্যাণ এখন আর এককভাবে জয় নিশ্চিত করার চাবিকাঠি নয়।
ভারতের রাজ্য রাজনীতিতে এখন ‘টপ-আপ’ সংস্কৃতির যুগ। তামিলনাড়ুর ডিএমকে থেকে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল (টিএমসি) কিংবা আসামের বিজেপি—প্রতিটি দলই অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তামিলনাড়ু যদি এক হাজার রুপি দেয়, তবে মহারাষ্ট্র বা অন্য রাজ্য দেড় হাজার রুপির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার ফলে ভোটারদের কাছে দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য কমে আসছে। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক লুইস টিলিনের মতে, যখন সব দলই একই সুবিধা দিচ্ছে, তখন ভোটারদের কাছে এটি আর ‘বোনাস’ নয়, বরং ‘ন্যূনতম অধিকার’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষা এই ধারাকে কেবল উৎসব নয়, বরং একটি সতর্কতা হিসেবে দেখছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর নাগাদ রাজ্যগুলো কেবল শর্তহীন নগদ সহায়তার জন্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে।
গত তিন বছরে এই ধরনের প্রকল্প চালুর হার পাঁচ গুণ বেড়েছে, যার মধ্যে অনেক রাজ্যই বর্তমানে চরম রাজস্ব ঘাটতিতে রয়েছে।
রাজ্যগুলোর আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি খরচ হচ্ছে বেতন, পেনশন এবং এই জাতীয় পৌনঃপুনিক ব্যয়ে। ফলে রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল এবং কর্মসংস্থান তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদেরা এটিকে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলে অভিহিত করছেন। এই ধরনের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে বলেই অর্থনীতিবিদদের মত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভানু জোশি একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, জনকল্যাণ এখন ভারতীয় রাজনীতির ‘ফ্লোর’ বা মেঝে। অর্থাৎ, এটি না থাকলে আপনি নির্বাচনে টিকে থাকতেই পারবেন না। কিন্তু জয়লাভের জন্য আপনাকে এই মেঝের ওপর ‘সিলিং’ বা ছাদ তৈরি করতে হবে। এই ছাদ হলো কর্মসংস্থান, সুশাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং পরিকাঠামো। ভোটাররা এখন প্রশ্ন তুলছেন—‘সাহায্য তো পেলাম, কিন্তু আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ বা কর্মসংস্থানের কী হবে?’
গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতীয় ভোটারদের মধ্যে একটি বড় অংশ এখন সুবিধাভোগী পরিচয়ের চেয়ে ‘অ্যাসপিরেশনাল’ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিচয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে।
নারীরাও এখন নগদ সহায়তাকে ভোটের বিনিময় হিসেবে দেখছেন না। তাঁরা মনে করেন, এটি ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের বিপরীতে সরকারের একটি সামান্য ক্ষতিপূরণ মাত্র। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও কর্ণাটকের নারী সুবিধাভোগীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ নারীই জানিয়েছেন তাঁরা শুধু নগদ টাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দলকে ভোট দেননি।
তামিলনাড়ু বা কেরালার মতো রাজ্যে, যেখানে সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, সেখানেও সরকার পরিবর্তনের ধারা দেখা যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, ভোটাররা এখন শুধু ‘উপহার’ নয়, বরং ‘অধিকার’ এবং মর্যাদাপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা খুঁজছেন।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ইয়ামিনি আইয়ার এই নতুন প্রবণতাকে ‘টেকনো প্যাট্রিমোনিয়ালিজম’ বলে অভিহিত করেছেন। সরকারগুলো প্রযুক্তি (ডিবিটি) ব্যবহার করে জনকল্যাণকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন এটি নেতার পক্ষ থেকে জনগণের জন্য একটি ‘ব্যক্তিগত উপহার’। এই ধারাটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ব্যক্তিগত দানে রূপান্তরিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভারতের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো দারিদ্র্য বিমোচনে বা আপৎকালীন সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এটি কর্মসংস্থান বা প্রবৃদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। ভোটাররা ক্রমান্বয়ে এটি উপলব্ধি করছেন, নগদ টাকা দিয়ে পকেট ভরালেও যদি বাজারদর নিয়ন্ত্রণে না থাকে বা ঘরের শিক্ষিত যুবকের চাকরি না হয়, তবে সেই টাকার মূল্য সামান্যই। ফলে আগামী দিনের নির্বাচনে জয়ী হতে হলে দলগুলোকে কেবল ‘উপহারের রাজনীতি’ নয়, বরং ‘উৎপাদনশীল রাজনীতির’ দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি সাউথ এশিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস এবং কিংস কলেজ লন্ডন

ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত ৯ মে মস্কোতে রাশিয়ার বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে তিনি বলেন—ইউক্রেন সংঘাতের বিষয়টি ‘সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে’ বলে তাঁর বিশ্বাস।
১৫ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা আলোচনায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
১৭ ঘণ্টা আগে
২০২৪ সালের দমবন্ধ করা গরমে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির হোঁচট খাওয়া অনেকের কাছেই ইঙ্গিত ছিল যে তাঁর এক দশকের শাসনের অবসান হয়তো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তিনি আগা আরও এক দশক পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
২১ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধ চীনের সামনে এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে বেইজিং। একই সঙ্গে এটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেকোনো যুদ্ধে প্রতিপক্ষও ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
১ দিন আগে