Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই–এর নিবন্ধ /সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্কের জোট: ইসরায়েলি আধিপত্যের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ নাকি কাগুজে বাঘ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্কের জোট: ইসরায়েলি আধিপত্যের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ নাকি কাগুজে বাঘ
ত্রিপক্ষীয় চুক্তি শেষে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ। ছবি: এএফপি

অক্টোবরে ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যা শুরুর তিন বছর পূর্ণ হবে। যেকোনো বিচারে এটি যুদ্ধাপরাধ। এই যুদ্ধাপরাধ ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন এবং ইরানেও পুনরাবৃত্তি করেছে। এই তিন বছরের অধিকাংশ সময় তুরস্ক এবং আরব বিশ্ব আতঙ্ক ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কার্যত কিছুই করেনি। অক্ষমতার সেই সম্মিলিত আর্তনাদ ছিল, ‘আমরা কী করতে পারি? ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করব?’

আঙ্কারায় এই কথা প্রায়ই শোনা যেত। অথচ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তুরস্ক আজারবাইজানের তেল তার একটি বন্দর দিয়ে প্রবাহিত হতে দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে। তুরস্ক অবশ্য ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি ও মার্কিন সশস্ত্র স্থল অনুপ্রবেশ ঠেকিয়েছিল। এই অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে ইরানি কুর্দি মিলিশিয়াদের ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আর সৌদি আরবও সম্মানজনকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু এই তিন বছরের অধিকাংশ সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে অঞ্চলটিকে নিজের মতো করে পুনর্গঠনের জন্য কার্যত কোনো বাধা ছিল না। তিনি দক্ষিণ সিরিয়ার একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছেন এবং এমন একটি নতুন উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, যেখানে ৪৫ কোটি আরবের ওপর ৭০ লাখেরও বেশি ইহুদি ইসরায়েলি আধিপত্য বিস্তার করবে।

গত সপ্তাহ পর্যন্তও এই পরিস্থিতিই কার্যকর ছিল।

কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে শেষ পর্যন্ত কী এমন বাধ্য করল যে—তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পেছনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পর তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করলেন, তা ইতিহাসবিদদেরই খুঁজে বের করতে হবে।

তবে অনুমান করতে হলে আমি বলব, চীনারাই বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝেছে। এখন পর্যন্ত চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছে, ‘আমেরিকা অবিশ্বস্ত: তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।’

চীন চাইলে এই চুক্তিকে একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে দেখাতে পারত। কিন্তু তারা তা করছে না। বরং চীনের দৃষ্টিতে এই চুক্তি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বিপর্যয়ের সরাসরি ফল। সিনহুয়া চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্সের ডিন এমেরিটাস ইয়ান শুয়েতুংকে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার নিচে থাকা আরব দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের প্রকৃত সামরিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেনি, বরং তাদের সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। শুয়েতুং বলেন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো বুঝতে শুরু করেছে যে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না, বরং নিজেদের ওপরই নির্ভর করতে হবে।’

এক শক্তিশালী জোট?

অন্তত কাগজে-কলমে এই তিন শক্তির মধ্যে সামরিক চুক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের নামমাত্র জিডিপি যথাক্রমে ৪৫২ বিলিয়ন, ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন এবং ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। তিন দেশ মিলিয়ে তাদের হাতে থাকতে পারে ৫ হাজার ৬০০টিরও বেশি ট্যাংক, ১ হাজার ১০০টির বেশি যুদ্ধবিমান, ড্রোনের বহর, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা এবং ১০ লাখেরও বেশি সেনাসদস্য।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিটি অংশীদারের উদ্দেশ্য অবশ্য আলাদা।

কমপক্ষে দুটি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়াইরত পাকিস্তানের প্রয়োজন অর্থ। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বুঝতে পারছে, তার সামরিক শক্তি এখন একটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এমনটাই জানিয়েছেন। পাকিস্তানের আরও প্রয়োজন ভারতের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। নয়াদিল্লির দৃষ্টি এ বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব কানওয়াল সিবাল এই চুক্তিকে ‘ভারতের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক এক ঘটনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, ভারতের উচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে তার কৌশলগত বিকল্পগুলো সম্প্রসারণ করা।

তুরস্কের প্রয়োজন একটি পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা, বিশেষ করে ইসরায়েলের ঘনঘন হুমকির প্রেক্ষাপটে। একই সঙ্গে দক্ষিণ সিরিয়া থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রত্যাহারে বাধ্য করার ক্ষেত্রে সিরিয়ার নতুন সরকারকে সহায়তা করাও তুরস্কের প্রয়োজন।

তুরস্কের দ্রুত সম্প্রসারিত সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সেরও নতুন বাজার প্রয়োজন। এই সামরিক চুক্তির যদি কোনো একক স্থপতি থেকে থাকেন—তিনি হলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এরদোয়ান রিয়াদের উদ্দেশে উড়ে যাওয়ার এক দিন আগে ফিদান বিশেষভাবে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টিকে ভয় পায়, তা হলো আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা। এখন পর্যন্ত নিজেদের হাতে থাকা বিস্তৃত সম্পদ, যার মধ্যে অন্যান্য দেশে অবস্থিত সম্পদও রয়েছে, ব্যবহার করে তারা একটি ভ্রম তৈরি করেছে। এই ভ্রমের ওপর ভিত্তি করে তারা একটি রাজনৈতিক কর্মকৌশল গড়ে তুলেছে, যা ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করে। তারা গণহত্যা চালায়, এমনকি তারপরও কিছুই ঘটে না।’

ফিদানের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট—ইসরায়েলের এতদিনের অবাধ সুবিধা বা ‘ফ্রি রাইড’ শেষ হওয়ার পথে। সৌদি আরবের প্রয়োজন ইরান এবং ইয়েমেনের হুতিদের ওপর একটি চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার। হুতিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রগুলোতে বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। সৌদি যুবরাজের রাজ্যকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও বারবার দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। কারণ, তাঁর দেশের চারপাশে চলতে থাকা যুদ্ধগুলো সেই পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে এসব কিছুর মধ্যে যে বিষয়টি অভিন্ন, তা হলো আমেরিকা এখন আর নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার নয়।

যুক্তরাষ্ট্র: এক অবিশ্বস্ত অংশীদার

এই পরিবর্তনের পেছনে আরও গভীরভাবে রয়েছে একটি উপলব্ধি: যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আমেরিকা তার ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব অন্যদের ওপর অর্পণ করতে চায়, সে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অক্ষম অথবা অনিচ্ছুক। অথচ পিছু হটতে থাকা ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের কাছে এই উপলব্ধি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দের একাংশ কার্যত ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভেঙে দিয়েছে। ওই চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র সব ফ্রন্টে, যার মধ্যে লেবাননও ছিল, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানসহ সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে বাধ্য ছিল।

ওয়াশিংটন প্রশাসনের যে অংশ এই সমঝোতায় সই করেছিল, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ করে ইসরায়েল লেবাননের প্রেসিডেন্সির সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে লেবানন সরকারের সঙ্গে নয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তার দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখতে এবং সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প রিয়াদের সামনে দাবি তোলেন, সৌদি আরবকে আগে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এই শর্তটি আলোচনায় বা চুক্তিতে ছিল না; বরং ইসরায়েলি লবিংয়ের ফল হিসেবে তা সামনে আসে। এরপর আসে গাজার হামাসের সঙ্গে বোর্ড অব পিসের স্বাক্ষরিত চুক্তি। সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র হতে রাজি হয়নি।

চুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই এমন একটি পাঠ্য, যেখানে বলা হয়েছিল হামাস তাদের ভারী অস্ত্র গাজার নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করবে, সেই অস্ত্রগুলোর একটি তালিকা বা ইনভেন্টরি তৈরি করা হবে এবং সেগুলো সংরক্ষণ করা হবে, সেটি বদলে দেওয়া হয়।

মূল শর্ত ছিল, ইসরায়েল পুরোপুরি প্রত্যাহার করার পরেই এসব অস্ত্রের হস্তান্তর, তালিকাভুক্তকরণ ও সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু নখদন্তহীন বোর্ড অব পিস সেটি পাল্টে লিখল যে ইসরায়েলি প্রত্যাহার ও অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ একই সঙ্গে এগোবে এবং হালকা ও ভারী সব অস্ত্রই ধ্বংস করে ফেলা হবে। শুধু তালিকাভুক্ত করে সংরক্ষণ করা হবে না। চুক্তির ভাষা বদলে দেওয়াতেই সন্তুষ্ট না থেকে ইসরায়েল এখন পুরো চুক্তিটিই নস্যাৎ করেছে। রোববার নেতানিয়াহু ট্রাম্পের বোর্ডের আলোচনায় তৈরি করা পরিকল্পনাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাস পর এবং এমন এক নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে, যেখানে ট্রাম্প কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতেও পারেন, ট্রাম্প চাইলেও নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থানে নেই। স্পষ্টতই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে। কিন্তু তা তার ইসরায়েলি মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং ট্রাম্পের দুর্বলতা নেতানিয়াহুকে আরও উৎসাহিত করছে। ট্রাম্পের ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে নেতানিয়াহু ঠিক সেই পদ্ধতিতেই মোকাবিলা করছেন, যেভাবে তিনি জো বাইডেনের মানসিক দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগিয়েছিলেন।

নিজের নভেম্বরের পুনর্নির্বাচন নিয়েও যখন গুরুতর অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে যখন তিনি মরিয়া, তখন নেতানিয়াহু ট্রাম্প মাত্র কয়েক দিন আগে যেটিকে ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার দিকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, সেটিকে বড় ধরনের পশ্চাদপসরণে পরিণত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ‘হামাসকে সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত কোনো প্রত্যাহার করবে না’ এবং তারা ‘আমাদের সেনা ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে হুমকি নস্যাৎ করতে’ গাজায় হামলা চালিয়ে যাবে।

গাজা কিংবা ইরান, কোনো ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের কথা তেল আবিবে শোনা যাচ্ছে না। বাইডেনের সময় যেমনটি করেছিল, এখন নেতানিয়াহুও পরীক্ষা করে দেখছেন, ইসরায়েলের ওপর বাস্তব চাপ প্রয়োগে ট্রাম্প কতটা প্রস্তুত।

নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে তাঁর পক্ষের লোকজন দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। ইসরায়েলি অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যান প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনে অত্যন্ত এক সুসংগঠিত যন্ত্র কাজ করছে, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য ইরানি কর্মকর্তাদের নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পরে সেগুলো ফক্স নিউজের নিউজরুমে সত্য হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে। ট্রাম্প এই যুদ্ধে প্রবেশ করেছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভরসা করে। সেই তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে সামান্য ধাক্কা দিলেই সেটি ভেঙে পড়বে। অর্থাৎ, এটি ছিল সহজে তুলে নেওয়ার মতো নিচু ঝুলন্ত ফল।

বাস্তবতা ঘটেছে ঠিক তার উল্টো।

ইসরায়েলের প্রকৃত এজেন্ডা

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক হামলার মধ্য দিয়েই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং এখন তারা মনে করছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত ট্রাম্পকে তারাই নির্ধারণ করে দিতে পারে। গত শনিবার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে তাদের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করতে হবে।

এর পরদিন, রোববার আইআরজিসি জানায়—তারা এখন হরমুজ প্রণালিকে শুধু একটি জলপথ হিসেবে নয়, বরং একটি ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, জুনে ওয়াশিংটন যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তার শর্তগুলো পূরণ করলেই কেবল তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে।

ট্রাম্প আবার যুদ্ধে ফিরে যেতে ইতস্তত করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ইরানকেও নিজের শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি খুলতে বাধ্য করতে পারছেন না। এই অবস্থায় প্রশ্ন হলো—মক্কা চুক্তি কি ট্রাম্পকে সদ্য স্বাক্ষর করা চুক্তি থেকে সরে আসা কিংবা ইসরায়েলকে কোনো যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়া থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিরত রাখতে পারবে?

তাৎক্ষণিকভাবে নয়।

গত রোববারই হুতিরা বলেছে, তারা লোহিত সাগরের উপকূলীয় ইয়েমেনের মোখা শহরে সৌদি সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এই জোট যদি সত্যিই কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিকভাবে কাজ করার পরিসর সংকুচিত হবে।

গাজা নিয়ে ইসরায়েলের ভিন্ন লক্ষ্য

গাজার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল, নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাইডেন কিংবা ট্রাম্প, কারও এজেন্ডার সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। দুই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং এখন বোর্ড অব পিস একটি ভ্রান্ত ধারণার ওপর কাজ করছে। তাদের ধারণা, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং হামাস নিরস্ত্র হয়ে গেলে ইসরায়েল গাজা থেকে সরে যাবে। তিন পক্ষই মনে করে, যুদ্ধটি সাময়িক।

কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। হামাস নিরস্ত্র হয়ে গেলেও ইসরায়েল গাজায় তার পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা প্রক্সি মিলিশিয়াগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে। এর ফলে একটি গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়া হবে, যা দ্রুত গাজার জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে সমুদ্রের দিকে ঠেলে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের স্থায়ী নির্বাসনে নিয়ে যাবে।

ইসরায়েলি মন্ত্রীরা গাজা থেকে ব্যাপক আকারে ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে খুব একটা রাখঢাক করেননি। সেই লক্ষ্য আজও বহাল রয়েছে। গাজায় কী ঘটতে পারে, তার সম্ভাব্য মডেল হলো ১৯৮২ সালের বৈরুত, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের সময়কার বৈরুত।

নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা

প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলও বৈরুত থেকে প্রত্যাহার করার আগে ইসরায়েলের কাছ থেকে দুটি বিষয়ে নিশ্চয়তা চেয়েছিল। প্রথমত, নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা এবং দ্বিতীয়ত, শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এসব নিশ্চয়তা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গ্যারান্টির মাধ্যমে সমর্থিত হওয়ার কথা ছিল।

এই নিশ্চয়তাগুলো ছিল প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের লেবাননবিষয়ক বিশেষ দূত ফিলিপ হাবিবের দুটি চিঠিতে। প্রয়াত ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের আলোচনাকারী দল বারবার বলেছিল, প্রত্যাহারের অন্যতম শর্ত ছিল শরণার্থী শিবিরগুলোতে রেখে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

লেবাননে থাকা ফিলিস্তিনিরা তাদের আশঙ্কা গোপন করেনি। তাদের ভয় ছিল, পিএলও চলে যাওয়ার পর লেবাননের খ্রিস্টান ফ্যালাঞ্জিস্টরা তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পাবে। বেগিন এবং ফ্যালাঞ্জিস্ট আন্দোলনের নেতা বাশির জেমায়েল, দুজনই হাবিবের আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। বেগিনের দেওয়া জবাবগুলো জেমায়েল সমর্থন করার পর হাবিব এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট পিএলওকে তাদের নিশ্চয়তা দেয়।

এরপর, ১৪ সেপ্টেম্বর জেমায়েলকে হত্যা করা হয় এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বৈরুতে প্রবেশ করে। পরদিন ইসরায়েলি এক জেনারেল এরিয়েল শ্যারন—যিনি পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হন—একটি ট্যাংকের ওপর বসে ছিলেন। ফ্লেয়ারের আলো জ্বেলে তিনি ফ্যালাঞ্জিস্ট যোদ্ধাদের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে প্রবেশের পথ দেখান। এর পরের দুই দিনে ফ্যালাঞ্জিস্টদের হাতে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও লেবাননের বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

সেই বছরের পরে মার্কিন সাংবাদিক মিল্টন ভিয়র্স মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কূটনীতিক চার্লস হিলের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি তোলেন। ভিয়র্সকে হিলের দেওয়া উত্তর আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। হিল বলেছিলেন, ‘আইনগতভাবে আমরা পিএলওর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার লঙ্ঘন করিনি। আমরা নিজেরা এই অঙ্গীকার করিনি। আমরা বলেছিলাম, অন্যদের কাছ থেকে আমাদের নিশ্চয়তা রয়েছে এবং সেই সময় এলাকায় আমাদের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী না থাকায় নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করার কোনো উপায় আমাদের ছিল না। আমরা পিএলওকে শুধু বলেছিলাম যে, আমরা নিশ্চিত অন্যরা তাদের প্রতি করা আমাদের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করবে।’

হিল আরও বলেন, ‘তবে বৈরুত থেকে পিএলওর সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের কথার ওপর নির্ভরশীল ছিল। আমাদের কথা না থাকলে ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা ভিন্নভাবে ঘটত। সাবরা ও শাতিলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বেগিন বলেছিলেন, ইসরায়েলকে এর জন্য দায়ী করা একটি রক্তের অপবাদ। কিন্তু এই ভবনের ভেতরে আমরা অনুভব করেছিলাম, যা ঘটেছে তার জন্য আমাদেরও দায় রয়েছে। নৈতিকভাবে আমরা তাদের ব্যর্থ করেছি।’

সাবরা ও শাতিলায় যা ঘটেছিল, তা ফিলিস্তিনি স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের উচিত নয় হামাসের সঙ্গে কিংবা গাজার জনগণের সঙ্গে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া।

মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ব্যবস্থার দিকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং বহুদিনের বিলম্বিত সূচনা। এতে যোগ দেওয়া মিসরের স্বার্থের সঙ্গেও সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্নটি কোনো অবক্ষয়মান আমেরিকা নয়, কিংবা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সেনারা কতটা বাড়াবাড়ি করার অনুমতি পাবে, সেটিও নয়। শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্ন হলো, নিজেদের ভূমি ও নিজেদের জনগণের ওপর আরব ও তুর্কি সার্বভৌমত্ব।

এই অঞ্চল কি এমন একটি ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের অধীনে আরও একটি শতাব্দীর জন্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে, যে ইসরায়েল যখন ইচ্ছা যুদ্ধ শুরু করে? নাকি সময় এসেছে, এই অঞ্চলের তিন বৃহত্তম শক্তি সেই চক্র ভেঙে দেওয়ার? সামরিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক দিক থেকে এত শক্তিশালী একটি চুক্তি যদি প্রথম বাধাতেই ভেঙে পড়ে, শুধু এই কারণে যে এর শাসকরা প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারছেন না, তাহলে প্রতিটি আরব সরকারই জানে, ইসরায়েল-প্রণোদিত পরবর্তী যুদ্ধের শিকার হতে যাচ্ছে তারাই।

মিডল ইস্ট আইয়ে লিখিত ডেভিড হার্স্টের নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত