হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত করতে গেরিলা কৌশলে জোর দিয়েছে ইরান। সংঘাতে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়া নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং অচলাবস্থায় থাকা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের অসম সামরিক কৌশল প্রয়োগ করছে তেহরান। পানির নিচে চলাচলকারী বিস্ফোরকবাহী ড্রোন, রকেটচালিত গ্রেনেড এবং জাহাজের গায়ে লিমপেট মাইন স্থাপনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে দেশটি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক কর্মকর্তারা, নিরাপত্তা সংস্থা ও সামরিক বিশ্লেষকেরা। পারস্য উপসাগর থেকে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে তেল পরিবহনে নিয়োজিত জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এই অভিযান ইরানের অসম সামরিক কৌশলের অংশ।
অন্যদিকে, ইরানের ওপর অবরোধ বজায় রাখার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ ও অপরিশোধিত তেল নিরাপদে বের করে আনতে প্রায় প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ব্যয়বহুল এই প্রচেষ্টার ফলে সম্প্রতি প্রণালিটি দিয়ে তেল পরিবহনের প্রবাহ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে এসেছিল।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পথ বন্ধ করতে ইরানের প্রচেষ্টা বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে একটি ছায়াযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইরানের হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হানছে মার্কিন বাহিনী।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
গত সোমবার হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা এবং মার্কিন সম্পদ ও চলাচলরত জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ বন্ধ করতে জলপথটিতে ধারাবাহিক কয়েকটি অঘোষিত ও সীমিত পরিসরের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলার অংশ হিসেবে ইরানের কেশম দ্বীপেও আঘাত হানা হয় বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০২ ডলারে লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলার সময় দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়ায় প্রায় ৪ ডলার ১৫ সেন্ট। যুদ্ধ শুরুর আগে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের সামান্য বেশি।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরান ও জ্বালানি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ‘তারা পরিস্থিতিকে সহিংস রাখতে পারে, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়িয়ে রাখতে পারে, ব্যয় বাড়াতে পারে এবং তেলের দামও উঁচুতে ধরে রাখতে পারে।’
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, জলপথটি ইরানের পেতে রাখা মাইন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করা হয়েছে। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, সংকীর্ণ এই জলপথে মার্কিন বাহিনীর টহল অব্যাহত রয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সংক্ষিপ্ত নাম উল্লেখ করে কুপার বলেন, ‘আমি সেখানে আইআরজিসির কাউকে একবারের জন্যও দেখতে পাইনি।’
অক্টোবরে হামলার রেকর্ড
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে গত অক্টোবরে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারের (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে ৩৫ টির বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নভেম্বরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি জাহাজে হামলা হয়েছে।
হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী পৃথক তেলবাহী চালান বাধাগ্রস্ত করা এবং জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন করে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা। যুদ্ধের শুরুতে ইরান জলপথটিতে হামলা চালাতে শুরু করলে জাহাজ চলাচল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। বর্তমান হামলার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে দেশটি।
জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পর অল্প সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে দুই দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার পর ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ পুনর্বহাল করেন ট্রাম্প।
এদিকে, কয়েক সপ্তাহ ধরে আইআরজিসি দাবি করে আসছে, তাদের বাহিনীর পেতে রাখা মাইনের আঘাতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও এসব দাবি প্রচার করা হয়েছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তাদের মতে, জাহাজ চলাচলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো এবং মাইন অপসারণে মার্কিন প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করাই এসব দাবির উদ্দেশ্য। এর মধ্য দিয়ে মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের প্রবাহ ব্যাহত করতে চায় ইরান।
পানির নিচের ড্রোন ও লিমপেট মাইনে হামলা
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানান, গত আগস্টের শেষ দিক থেকে ইরান বিস্ফোরকবাহী পানির নিচে চলাচলকারী সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে তেহরানের কর্তৃপক্ষ এসব হামলার সুনির্দিষ্ট ধরন সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু স্বীকার করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালিতে এখনো মাইন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, এমন ধারণা বজায় রাখার কৌশলের অংশ হিসেবেই হামলাগুলোর প্রকৃতি প্রকাশ করা হচ্ছে না।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজ অচল করতে ইরান আবারও লিমপেট মাইনের ব্যবহার শুরু করেছে। ২০১৯ সালেও দেশটি এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছিল।
শুক্রবার ওমানের ঠিক উত্তরে হরমুজ প্রণালির জলসীমায় একটি ছোট নৌকা একটি তেলবাহী ট্যাংকারের কাছে যায়। পরে নৌকাটিতে থাকা ব্যক্তিরা ট্যাংকারটির বাঁ পাশের পানির ওপরের অংশে জাহাজের গায়ে দুটি বিস্ফোরক স্থাপন করে। পরবর্তী বিস্ফোরণে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে আগুন ধরে যায় এবং সেটি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে ইউকেএমটিও।
২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের কাছে জাহাজে লিমপেট মাইন ব্যবহার করেছিল ইরান বলে জানিয়েছিল মার্কিন নৌবাহিনী। সে সময় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছিল।
নৌবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির পর বেসামরিক নৌযানকে নজরদারিতে ব্যবহার
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ইরানের হামলার পরিধি ও লক্ষ্যবস্তুর ধরনও বিস্তৃত হয়েছে। এখন শুধু তেলবাহী ট্যাংকার নয়, কনটেইনারবাহী জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার বা পণ্যবাহী জাহাজ এবং গ্যাসবাহী জাহাজও হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এমনকি হরমুজ প্রণালির বাইরে পারস্য উপসাগরের অন্যান্য এলাকায় নোঙর করে থাকা জাহাজও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, বারবার মার্কিন বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় ইরান এখন ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় রাডারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মানব পর্যবেক্ষকদের ব্যবহারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে মাছ ধরার নৌকার ভিড়ের মধ্যে গোপনে চলাচলকারী ছোট ছোট নৌকার ক্রুরা আশপাশ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এরপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনাকারীদের কাছে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত তথ্য পাঠাতে পারে তারা। এ ধরনের নজরদারি শনাক্ত করা এবং প্রতিহত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠিন।
ইরানের হামলা সম্পর্কে অবগত একজন আরব কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে, এমন এলাকাগুলোর আশপাশে এসব নৌযানকে প্রায়ই ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে সামরিক অভিযানে বেসামরিক নৌযান ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেশটির জন্য বেড়ে গিয়ে থাকতে পারে।
লন্ডনের কিংস কলেজের সামুদ্রিক যুদ্ধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলেসিও পাটালানো বলেন, ‘ইরান খুব সামান্য খরচে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকায় মার্কিন বাহিনীর পক্ষে এসব হামলা শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধ করা আরও কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে।’
তেল পরিবহনে পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত, বাড়ছে ব্যয়
হরমুজ প্রণালিতে হামলার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে তেল পরিবহনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। পরবর্তী সময়ে এসব পরিসংখ্যান সংশোধন করে বাড়ানো হতে পারে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের পরিমাণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ।
এর আগে অক্টোবরের শুরুর দিকে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের প্রবাহ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। প্যারিসভিত্তিক আন্তঃসরকারি জ্বালানি পর্যবেক্ষণ সংস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়ায় প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭ ডলার। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এই ব্যয় পাঁচ গুণেরও বেশি।










